মো. বশিরুল ইসলাম
গত ২৯ আগস্ট বিসিএস (খাদ্য) কর্মকর্তা রিয়াজুর রহমান রাজু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন রাজধানীর মিরপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে। কয়েকদিনের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ৪ সেপ্টেম্বর তিনি বাসায় ফেরেন। কিন্তু হাসপাতালের সেই সময়টি তার কাছে ছিল জীবন-মৃত্যুর এক কঠিন অভিজ্ঞতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, একপর্যায়ে তার প্লাটিলেট ৬ হাজারে নেমে গিয়েছিল। চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। সুস্থ হয়ে ফিরলেও তার লেখার সবচেয়ে কষ্টের অংশ ছিল পরিচিতদের হারানোর খবর। তিনি লিখেছেন, তাঁর পরিচিত আকবর ও বন্ধু টিপুর ভাগ্নি ডেঙ্গুতে মারা গেছেন।
রাজুর অভিজ্ঞতা কেবল একজন রোগীর ব্যক্তিগত গল্প নয়। দেশের বহু পরিবার এখন একই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কেউ হাসপাতালে লড়ছেন, আবার কেউ প্রিয়জনকে হারিয়ে শূন্য হাতে ফিরছেন। ডেঙ্গু তাই শুধু একটি রোগের নাম নয়; এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক দায়িত্বের সামনে একটি বড় প্রশ্ন দাঁড় করায়। প্রশ্নটি হলো, ডেঙ্গুর সঙ্গে কি আমাদের স্থায়ীভাবে বাস করতে হবে? উত্তর অবশ্যই ‘না’। তবে মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল বদলাতে হবে। শুধু মশা মারা নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
সাম্প্রতিক ডেঙ্গু পরিস্থিতির চিত্রও আমাদের সেই জরুরি তাগিদের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬১ হাজার ৯৭২ জন এবং মারা গেছেন ১৮৪ জন। বিগত বছরগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল আরও ভয়াবহ। ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জন মারা যান। আবহাওয়া পরিবর্তন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে ডেঙ্গু এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই, বরং বছরজুড়েই এর ঝুঁকি থাকছে। এতে স্পষ্ট যে, এটি পুরো দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রকৃতি জানা জরুরি। ভাইরাসের চারটি পৃথক সেরোটাইপ রয়েছে ডিইএনভি-১, ২, ৩ ও ৪। একবার একটি সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে অন্যগুলোর বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না; বরং দ্বিতীয়বার ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে হেমোরেজিক ফিভার বা শক সিনড্রোমের ঝুঁকি বাড়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ডিইএনভি-৩ প্রধান হয়ে উঠেছে, যা ২০২৫ সালে ছিল ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েছে ৯১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। ফলে পূর্বে ডিইএনভি-২-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা এখন নতুন সেরোটাইপে আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো নির্দিষ্ট সেরোটাইপকে এককভাবে ভয়াবহ না বলে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও ভাইরাসের ধরনের ওপর নির্ভর করেই রোগের তীব্রতা বিচার করা উচিত।
ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস ইজিপ্টি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস নামের দুই স্ত্রী মশার মাধ্যমে। ডিম পাড়ার জন্য রক্তের প্রয়োজনে কেবল স্ত্রী মশা মানুষকে কামড়ায়। পুরুষ মশা ফুলের মধু ও উদ্ভিদের রস খেয়ে বাঁচে। এই মশার জীবনচক্রে চারটি ধাপ—ডিম, লার্ভা, পিউপা, পূর্ণাঙ্গ মশা। এডিস মশা পানির পাত্রের গায়ে বা পানির কাছাকাছি ভেজা জায়গায় ডিম পাড়ে। ডিমগুলো পানির সংস্পর্শে না এলে অনেক দিন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। পানিতে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়, যা কয়েকবার খোলস বদলায়। এরপর পিউপা পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন মশা খাবার খায় না কিন্তু পানিতেই থাকে। সবশেষে পূর্ণাঙ্গ মশা বেরিয়ে আসে এবং নতুন প্রজননচক্র শুরু করে। অনুকূল পরিবেশে এই পুরো জীবনচক্র মাত্র সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে। লক্ষণীয়, এই চারটি ধাপের প্রথম তিনটি ধাপ সম্পূর্ণ পানিতে সম্পন্ন হয়। অর্থাৎ, জমে থাকা পানি না থাকলে এই মশা বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। এ জায়গাতেই কৃষির সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে।
কৃষিক্ষেত্রে কোনো পোকার আক্রমণ হলে কৃষক শুধু আক্রান্ত পোকা মারার ওপর নির্ভর করেন না। তিনি খতিয়ে দেখেন পোকাটির উৎস কোথায়, কোথায় ডিম পেড়েছে এবং কীভাবে তার জীবনচক্র ভেঙে দেওয়া যায়। আধুনিক কৃষির সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় (আইপিএম) এ কারণেই শুধু কীটনাশক নয়, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেও একই ধরনের চিন্তা প্রয়োজন। শুধু ফগিং করে পূর্ণাঙ্গ মশা মারলে ডিম, লার্ভা ও পিউপা ধ্বংস হয় না। তাই প্রজননস্থল নিয়মিত বন্ধ রাখা ও উৎসস্থল ব্যবস্থাপনাকে মূল কৌশল বানাতে হবে। তবে মশক নিয়ন্ত্রণ শুধু সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের ওপর ছেড়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। এডিস মশার বড় অংশ মানুষের বাসস্থানের কাছেই জন্মায়।
ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, গ্যারেজ বা উঠানে জমে থাকা পানি মশার আদর্শ প্রজননকেন্দ্র। তাই প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একবার জমে থাকা পানি ফেলে পাত্র পরিষ্কার করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় তরুণদের সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। পাড়া-মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করে সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত ও পরিষ্কার করা যেতে পারে। প্রযুক্তির সাহায্যে মানচিত্র তৈরি করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। একজন সচেতন তরুণ হয়তো মশা মারবে না, কিন্তু সে একটি প্রজননস্থল চিরতরে নির্মূল করতে পারে- যা ফগিংয়ের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করেছেন, যা চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত। উদ্বোধনী ভাষণে তিনি বলেন- ‘আসুন, এবার রাষ্ট্রকে, দেশকে আমরা পুনর্গঠন করি। আগামী তিন মাসে আমাদের ডেঙ্গুর সমস্যা আমরা সমাধান করার চেষ্টা করি। হয়তো আমরা শতভাগ পারব না, কিন্তু অন্তত ৮০ শতাংশ আমরা পারব।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘মশা যাতে জন্মাতে না পারে, সেটাই সবচেয়ে নিরাপদ ও সহজ উপায়।’ তিনি প্রতিটি নাগরিককে সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা নিজের বাসস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থল পরিষ্কারের আহ্বান জানান।
পরিবেশবান্ধব ও সহজ কিছু উপায়ে মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গাপ্পি মাছ প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০টি মশার লার্ভা খায়; বালতি বা ড্রামে এই মাছ ছেড়ে দিলে লার্ভা ধ্বংস হয়। নিম তেল পানিতে ছিটালে লার্ভা মরে এবং শরীরে মাখলে মশা দূরে থাকে। বিটিআই নামের ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক লার্ভিসাইড মানুষ ও পরিবেশের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। এ ছাড়া বারান্দা বা ছাদে গাঁদা, তুলসী, লেমনগ্রাস ও সিট্রোনেলা গাছ লাগালে মশা প্রাকৃতিকভাবেই দূরে থাকে। এই সহজ অভ্যাসগুলো প্রয়োগ করলে ডেঙ্গুর বিস্তার ব্যাপক হারে কমে আসবে।
সচেতনতা অভিযান কেবল নগরে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। জ্বর হলেই অবহেলা করা যাবে না। তীব্র পেটব্যথা, বমি, রক্তপাত বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না। কারণ তা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। রোগীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি, স্যালাইন, ভিটামিন-সি ও আয়রনযুক্ত খাবার প্রয়োজন।
বিশ্বজুড়ে মশা নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। সিঙ্গাপুরে ওলবাকিয়া প্রযুক্তিতে এডিস মশা ৮০-৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বাংলাদেশেও আইসিডিডিআরবি ও পরমাণু শক্তি কমিশন ওলবাকিয়া এবং এসআইটি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। তবে এসব প্রযুক্তি ব্যাপক হারে মাঠে প্রয়োগে সময়ের প্রয়োজন। তাই প্রযুক্তির অপেক্ষায় না থেকে হাতের কাছের সবচেয়ে সহজ সমাধান- পানি জমতে না দেওয়া, বাস্তবায়ন করতে হবে। আজ রাজু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন; কাল যেন অন্য কাউকে আইসিইউয়ের দরজায় দাঁড়াতে না হয়, ওই দায়িত্ব আমাদের সবার। কৃষকের মাঠের শিক্ষা খুব পরিষ্কার: কেবল পোকা মারলে হবে না, পোকার বংশবিস্তার বন্ধ করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেও প্রথম কাজ- মশার জন্মস্থান চিরতরে ধ্বংস করা।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬