মাহমুদ আহমদ
সবার উদ্দেশ্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন অতিবাহিত করা। আর এই সুখ-শান্তি ও আনন্দময় জীবনের জন্য ইসলামি জীবনাদর্শ মেনে চলার বিকল্প নেই। ইসলামি জীবনাদর্শের মধ্যে হালাল উপার্জনের বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই উপদেশ পালনের মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত প্রশান্তি। হালাল উপার্জন জীবনে প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা দেয়, মানুষের আত্মাকে পবিত্র করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে সাহায্য করে।
হালাল উপার্জনই শ্রেষ্ঠ উপার্জন। কিন্তু আজ আমরা সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে এতটাই লাগামহীন হয়ে গেছি যে হালাল-হারাম দেখার যেন সময়ই নেই। বর্তমান সময়ে যখন অবৈধ ও হারাম উপার্জনের ফাঁদ চারদিকে বিস্তৃত, তখন হালাল পথে উপার্জনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য আরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হালাল উপার্জনের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। একাধিক হাদিসে তিনি হালাল জীবিকার ফজিলত ও হারামের ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হালাল উপার্জন করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর ফরজ’ (মুসনাদে আহমদ)। অন্য এক হাদিসে এসেছে- ‘যে মাংস হারাম দ্বারা গঠিত হয়, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না’ (তিরমিজি)। এই হাদিসগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, যদি একজন ব্যক্তি হারাম উপার্জন করে; তাহলে তা তার দেহের অংশ হয়ে যায় এবং সেই দেহ জান্নাতে প্রবেশের অযোগ্য হয়ে পড়ে। আসলে হালাল রিজিকের মাধ্যমে একজন মুসলিম মানসিক প্রশান্তি ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করে। বৈধ উপায়ে উপার্জন করার ফলে মানুষ অভ্যন্তরীণ শান্তি অনুভব করে এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। বিশ্বনবী ও শ্রেষ্ঠনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, ‘মানুষের এমন এক কাল অতিক্রম করবে- যাতে মানুষ এ কথার চিন্তা করবে না যে, সম্পদ উপার্জন করা হচ্ছে; তা হালাল না হারাম?’ (মিশকাত)।
বর্তমানে আমরা এমন যুগই অতিক্রম করছি। অথচ রিজিকের মালিক হলেন সৃষ্টিকর্তা। তিনি যাকে চান প্রভূত রিজিক দান করেন। আমাদের কাজ হলো তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী পরিশ্রম করে হালাল উপার্জন করা। যেভাবে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন: ‘তুমি বল, নিশ্চয় আমার রব যার জন্য চান রিজিক সম্প্রসারিত করে দেন এবং সংকুচিতও করে দেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না’ (সুরা সাবা : আয়াত ৩৬)।
হালাল রিজিক গ্রহণের অন্যতম গুরুত্ব হচ্ছে, এটি নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়। একজন সৎ ব্যক্তি হালাল উপায়ে উপার্জন করে সমাজে মর্যাদা পায় এবং মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। সৎ উপার্জনের মাধ্যমে মানুষের মাঝে সৎ গুণাবলির উন্নয়ন হয়। ইসলাম এমন একটি শান্তিপ্রিয় ধর্ম, যেখানে সবকিছুর সমাধান বিদ্যমান। একজন মানুষ কেবল তখনই শান্তির ধর্মের প্রকৃত অনুসারী হতে পারে, যখন সে আল্লাহর সকল নির্দেশাবলির ওপর আমল করে চলে। আল্লাহর নির্দেশাবলির ওপর পরিপূর্ণ আমল করলে রিজিকেরও ঘাটতি হতে পারে না। মূলত আমাদের নিজেদের ভুলের জন্যই সংসারে অভাব-অনটন দেখা দেয়। সংসারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য হালাল জীবিকার গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা ইবাদত কবুলের পূর্বশর্তই হলো হালাল জীবিকা উপার্জন করা।
আল্লাহর রাসুল (সা.) হালাল রোজগারের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। হাদিসে এসেছে, হজরত যুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) বলেন, হজরত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের কেউ তার রশি নিয়ে চলে যাক, পিঠে কাঠের বোঝা বহন করে এনে তা বিক্রি করুক এবং তার চেহারাকে আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা করুক। এটা তার জন্য মানুষের কাছে ভিক্ষা করার চেয়ে উত্তম। চাই তাকে দান করুক বা না করুক’ (মুসলিম)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের ময়দানে বনু আদমকে পাঁচটি প্রশ্ন করা হবে। সেই পাঁচটি প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত কোনো মানুষ অর্ধ হাত পরিমাণ সামনে অগ্রসর হতে পারবে না। তার মধ্যে একটি হলো—সে কোন পথে উপার্জন করেছে’ (তিরমিজি)।
হালাল উপার্জনের পাশাপাশি রিজিক বৃদ্ধির জন্য আমাদের সব সময় দোয়াও করতে হবে। অভাব মোচনে যে দোয়াটি আমরা অধিক পাঠ করতে পারি- ‘আল্লাহুম্মা রাব্বানা আনযিল আলায়না মা ইদাতাম মিনাস সামাই তাকুনু লানা ঈদাল্লি আওওয়ালিনা ওয়া আখিরিনা ওয়া আয়াতাম মিনকা ওয়ারযুকনা ওয়া আনতা খায়রুর রাযিকিন’ (সুরা মায়েদা : আয়াত ১১৪)। এর অর্থ- ‘হে আমাদের প্রভু-প্রতিপালক আল্লাহ! তুমি আকাশ থেকে আমাদের জন্য খাবারভর্তি খাঞ্চা অবতীর্ণ করো- যেন তা আমাদের প্রথম অংশের জন্য আর আমাদের শেষ অংশের জন্য আনন্দোৎসব হবে এবং তোমার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন হয়। তুমি আমাদের রিজিক দান করো। প্রকৃতপক্ষে তুমিই উত্তম রিজিকদাতা’।
আমরা যদি সব সময় দোয়া করি আর হালাল রিজিক ভক্ষণ করি, তাহলে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারব। হজরত আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি হালাল রিজিক ভক্ষণ করল আর সুন্নত মতে আমল করল এবং মানুষ তার কষ্ট থেকে নিরাপদ রইল, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তখন এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসুল, এ ধরনের লোক বর্তমানে অনেক। তিনি বলেন, আমার পরে তা কয়েক যুগ পাওয়া যাবে’ (তিরমিজি)। এ ছাড়া বেশি বেশি ইস্তেগফার করলেও রিজিক বৃদ্ধি পায় আর অভাব মোচন হয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন’ (আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ)। আসলে আমাদের মাঝে যখন অভাব দেখা দেয়, তখন আল্লাহর দিকে ঝুঁকি। কিন্তু অভাব দূর হওয়া মাত্রই আল্লাহকে ভুলে যাই আর কৃপণতা দেখাই।
আজ বেশির ভাগ পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ আর অশান্তি যেন লেগেই আছে। সংসারে শান্তি নেই, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে পিতামাতার সম্পর্ক নেই, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল নেই। ফলে প্রতিদিন কতই না সংসার ভেঙে যাচ্ছে। আমি মনে করি, পরিবারে অশান্তির কারণগুলোর মধ্যে বিশেষ একটি কারণ হলো অধিক চাহিদা আর হারাম উপার্জন। মানুষের চাহিদা যখন বেড়ে যায়, তখন অপ্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য সে আর হালাল-হারাম নিয়ে ভাবে না। আমরা যদি খেয়াল করি, তাহলে দেখতে পাই- যারা হালাল উপার্জন করে সহজ-সরল জীবনযাপন করেন; তাদের পরিবারের সদস্যরা এমনিতেই স্বল্পতুষ্ট থাকেন। তাদের এত চাহিদাও নেই আর পরিবারে সব সময় বিরাজ করে অনাবিল সুখ-শান্তি।
যারা ব্যবসায়ী আছেন, তারা যদি পণ্যে ভেজাল দেন, ওজনে বা পরিমাণে কম দেন, নকল পণ্য বিক্রি করেন; মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নেন, তাহলে তাদের উপার্জন হালাল হবে না। ক্রেতাও যদি কোনোভাবে বিক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা করেন, তাহলে তার রিজিকও হালাল হবে না। ঠিক তেমনি শ্রমিক যদি তার মনিবকে ফাঁকি দেন, তাহলেও তার উপার্জন হালাল হবে না। অন্যদিকে মনিবও যদি তার শ্রমিককে ঠকান, ন্যায্য পাওনা না দেন; তাহলে তার সম্পদও হালাল হবে না। তাই বিষয়টি অনেক কঠিন। আমরা হালাল যে কাজই করি না কেন, আমাদের মাঝে সততা থাকতে হবে। আরেকটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের আল্লাহর হক এবং বান্দার হক পরিপূর্ণভাবে আদায় করতে হবে। আমরা যদি আমাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখি, তাহলে আল্লাহতায়ালা আমাদের রিজিকে বরকত দেবেন আর আমাদের আয়ু বাড়িয়ে দেবেন।
এ বিষয়ে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেন- ‘যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক, সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে’ (বুখারি ও মুসলিম)। আরেক হাদিসে এসেছে- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি) তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট নয়, বরং সব আপনজন, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে আর এটাই পবিত্র কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশ। আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে আমরা আমাদের রিজিক প্রশস্ত করতে পারব। তাই এ বিষয়টি আমাদের সবসময় দৃষ্টিতে রাখতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো হালাল উপার্জন। আসলে হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবনযাপন না করলে ইবাদত কবুল হয় না। শুধু তা-ই নয়, হালাল উপার্জনে পরিবার হয় শান্তিময় এবং সংসার হয় সুখের। আল্লাহতাআলা আমাদের হালাল উপার্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও ইসলামি চিন্তাবিদ
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬