বগুড়ার গ্রামীণ জনপদে এখন পাট ঘিরে উৎসবের আমেজ। মাঠজুড়ে সবুজ পাটের সারি। কোথাও কৃষক পাট কাটছেন, কোথাও আঁটি বেঁধে জাগ দিচ্ছেন। আবার কোথাও জলাশয় থেকে পাটের আঁশ ছাড়িয়ে রোদে শুকানো হচ্ছে। পাশাপাশি পাটখড়ি সংগ্রহ ও বাজারজাত করতেও ব্যস্ত কৃষক-কৃষানিরা।
অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত এবং তুলনামূলক কম রোগবালাইয়ের কারণে চলতি মৌসুমে বগুড়ায় পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। একই সঙ্গে বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহও বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাওয়ায় অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে পাটের আবাদ আরো বাড়ানোর কথা ভাবছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বগুড়ায় ৭ হাজার ৭২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে মোট ১ লাখ ৯ হাজার ৪৭৯ মেট্রিক টন পাট উৎপাদন হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড় ফলন হয়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ১৯ মেট্রিক টন। গত বছরের তুলনায় আবাদ ও উৎপাদন বাড়ায় পাটকে ঘিরে কৃষকদের প্রত্যাশাও বেড়েছে।
জেলার সারিয়াকান্দি, ধুনট, শিবগঞ্জ, শাজাহানপুর ও শেরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন পাট কাটার ধুম পড়েছে। কোনো কোনো মাঠে পাট কাটা প্রায় শেষ, আবার কোথাও চলছে জাগ দেওয়ার কাজ। এরপর আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া, শুকানো ও পাটখড়ি সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া পাট চাষের জন্য বেশ অনুকূলে ছিল। প্রয়োজনীয় সময়ে বৃষ্টি হওয়ায় অনেক এলাকায় সেচের প্রয়োজন কমেছে। পাশাপাশি রোগবালাইও তুলনামূলক কম থাকায় উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সারিয়াকান্দি উপজেলার বোয়াইল চরের পাটচাষি কাদের মিয়া বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। রোগবালাইও কম ছিল। প্রতি বিঘায় গত বছরের তুলনায় বেশি পাট পেয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাট ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারছেন। এতে খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাভ হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাজারে এ ধরনের দাম থাকলে কৃষক পাট চাষে আরো আগ্রহী হবেন। তবে দাম যাতে মৌসুমের মাঝপথে কমে না যায়, সেদিকে সরকারের নজর রাখা দরকার।
চরের আরেক পাটচাষি সাইদুর রহমান বলেন, এবার ফলন ভালো হয়েছে, পাটের আঁশের মানও ভালো। সময়মতো বৃষ্টি পাওয়ায় সেচ খরচ কমেছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম পেলে কৃষকরা আগামীতে আরো বেশি পাট চাষ করবেন।
পাট কাটার সঙ্গে সঙ্গে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারেও নতুন পাটের কেনাবেচা জমে উঠেছে। কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। পরে এসব পাট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মোকামে পাঠানো হচ্ছে।
বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ পাটের দাম প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকা। মৌসুমের বিভিন্ন সময়ে ভালো মানের পাটের দাম আরো বেশি ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে পাটখড়ি বিক্রি করেও কৃষকরা বাড়তি আয় করছেন। বিভিন্ন এলাকায় পাটখড়ির আঁটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।
ধুনট উপজেলার চিকাশী ইউনিয়নের কৃষক আফিজার রহমান বলেন, পাটের ফলন ভালো হয়েছে। বাজারদরও মোটামুটি ভালো। তবে উৎপাদন খরচের তুলনায় পাটের দাম আরো ভালো হলে কৃষকরা বেশি লাভবান হবেন। তখন আগামী মৌসুমে আবাদও বাড়বে।
পাট ব্যবসায়ী মোয়াজ্জেম আলী বলেন, এবার বাজারে পাটের সরবরাহ ভালো। কৃষকরা নিয়মিত পাট নিয়ে আসছেন। মান ভালো হওয়ায় ব্যবসায়ীদেরও পাট কেনার আগ্রহ আছে। এখানকার পাট দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে।
ভালো ফলন ও বাজারদর নিয়ে কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি থাকলেও মৌসুমের মাঝপথে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর একটি শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে পাটের দাম কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন কৃষকরা।
কৃষকদের দাবি, পাটের মৌসুমে বাজার তদারকি জোরদার করা এবং কোনো পক্ষ যাতে কৃত্রিমভাবে দাম কমিয়ে দিতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে তারা আরো উৎসাহিত হবেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়ার উপপরিচালক কৃষিবিদ সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় পাটের আবাদ বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো বাজারদর পাওয়ায় কৃষকরাও পাট চাষে আগ্রহী হয়েছেন।
তিনি বলেন, এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকরা ভালো দামও পেয়েছেন। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। দাম যদি এভাবে ভালো থাকে, তাহলে কৃষক ভবিষ্যতে পাট চাষে আরও উৎসাহিত হবেন এবং জেলায় পাটের আবাদ আরও বাড়বে।
একসময় বগুড়ার অনেক এলাকায় পাট ছিল প্রধান অর্থকরী ফসলগুলোর একটি। সময়ের সঙ্গে আবাদ কমলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভালো দাম ও উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভের সম্ভাবনায় আবারো কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে।
এসি/আপ্র/২৪/৯/২০২৬