একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম: দেশে এলপিজির আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও চট্টগ্রামের বাজারে গত এক সপ্তাহ ধরে চলছে সরবরাহ সংকট। নগরের বিভিন্ন এলাকায় কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না, আবার কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে ১২ কেজির সিলিন্ডার। এর মধ্যে গত রোববার (৪ অক্টোবর) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮১০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সরবরাহ সংকটের মধ্যে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধিতে রান্নার গ্যাস নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকেরা।
নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, সরকারি নির্দেশনা থাকলেও অনেক বিক্রেতা নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করছেন না। অতিরিক্ত দাম আদায় বন্ধে কার্যকর নজরদারিও নেই। ফলে একদিকে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে পাওয়া গেলেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা।
জানা গেছে, মহানগরের বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও ও লালখান বাজারের বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রে এলপিজি সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় তা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। কোথাও কোথাও বেশি দাম দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা মামুনুল ইসলাম বলেন, দুই সপ্তাহ আগে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনেছিলেন। এখন একই সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকায়। তাঁর অভিযোগ, সরকার দাম নির্ধারণ করলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। এতে সাধারণ ভোক্তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, বাজারে প্রকাশ্যে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি চোখে পড়ছে না। নিয়মিত বাজার অভিযান ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছামতো দাম আদায় করছেন। ফলে একদিকে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে।
চট্টগ্রামে এলপিজি সরবরাহকারী একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মুজিবুল হক বলেন, সকালে শুধু ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার ছিল। পরে সেটিও শেষ হয়ে যায়। অনেক ক্রেতা বেশি দাম দিতেও রাজি ছিলেন। কিন্তু সরবরাহ না থাকায় কাউকে সিলিন্ডার দেওয়া সম্ভব হয়নি।
বহদ্দারহাট এলাকার সিলিন্ডার বিক্রেতা আব্দুল মুমিন বলেন, ডিলারদের কাছে গ্যাস চেয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনেও রশিদ ছাড়া লেনদেন করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কম দামে কিনতে পারলে গ্রাহক পর্যায়ে কম দামে বিক্রি করতে পারি। এখন আমিও নিরুপায়।’
আমদানি বাড়লেও বাজারে সরবরাহ সংকট, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় এবং নতুন করে মূল্যবৃদ্ধিতে চট্টগ্রামের এলপিজি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। একদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতিতে বিকল্প জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে বাজার তদারকির দুর্বলতার অভিযোগে ভোক্তাদের ভোগান্তি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক করা, সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
তবে দেশে এলপিজির ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছে বিইআরসি। সংস্থাটির উপপরিচালক (গ্যাস) ফিরোজ জামান জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তবে চাহিদার বিপরীতে এলপিজির ঘাটতি নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের ভিত্তিতে আমদানি ব্যয়সহ অন্যান্য খরচ হিসাব করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, এলপিজি সরবরাহকারীদের ওপর তদারকি বাড়ানো হয়েছে। রোববারও অভিযান হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ফাঁকফোকরগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। শিগগিরই বাজার তদারকির বিষয়টি আরো জোরদার করা হবে।’
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৫/১০/২০২৬