গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

বৈধ ভারতীয় নাগরিক হয়েও সীমান্তে ঠেলে দেওয়া সাইদার আর্তনাদ

‘আমার দুই সন্তান ভারতে, আমাকে ফিরিয়ে দিন’

আবদুল্লাহ আল মামুন, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

আবদুল্লাহ আল মামুন, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০২:৩৮ পিএম, ০৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ০৯:৪৩ এএম ২০২৬
‘আমার দুই সন্তান ভারতে, আমাকে ফিরিয়ে দিন’
ছবি

ভুক্তভোগী সাইদা ফকির পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার স্বরূপনগর ব্লকের গোবিন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা -প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

কাদামাটি মাখা ছেঁড়া কাপড়, ফুলে ওঠা হাত-পা আর বুকফাটা কান্না—সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এক গ্রামের উঠানে বসে বারবার শুধু একটাই কথা বলছিলেন সাইদা ফকির, ‘আমার দুই সন্তান ভারতে আছে, আমাকে আমার দেশে ফিরিয়ে দিন।’ তার সেই আর্তনাদ এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, সীমান্ত পেরিয়ে মানবাধিকার ও মানবিকতার এক গভীর প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, বাংলা ভাষায় কথা বলা এবং মুসলিম পরিচয়ের কারণে পশ্চিমবঙ্গের এক নারীকে অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে ভারতের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। অথচ তার কাছে ছিল ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড, জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং পৈতৃক সম্পত্তির দলিলসহ বৈধ ভারতীয় নাগরিকত্বের একাধিক প্রমাণ।

ভুক্তভোগী সাইদা ফকির (৫০) পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার স্বরূপনগর ব্লকের গোবিন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। স্বামী জুম্মান ফকিরের সঙ্গে প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি মুম্বাইয়ে বসবাস ও কাজ করছিলেন।

বাজার থেকে ফেরার পথে দুঃস্বপ্ন
সাইদা জানান, গত ১৯ জুলাই রাতে মুম্বাইয়ের একটি স্থানীয় বাজার থেকে সবজি ও রুটি কিনে ফেরার সময় সিআইডি পরিচয়ে ৪-৫ জনের একটি দল তাকে আটক করে। তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তিনি নিজেকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করে পরিচয়পত্র দেখাতে চাইলে তা দেখতে অস্বীকৃতি জানানো হয়।

এরপর তাকে মুম্বাইয়ের চেম্বুর ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে চার দিন আটকে রাখা হয়। স্বজনেরা প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে সেখানে গেলেও সেগুলো গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ তার।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাইদা বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি আমি ভারতের মানুষ। আমার বাড়ি বসিরহাটে। আমার কাগজপত্র আছে। কিন্তু কেউ আমার কথা শোনেনি।’

বিমান, সীমান্ত, তারপর অচেনা দেশ
চার দিন পর তাকে বিমানে করে আসাম সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কয়েকজনকে একসঙ্গে জড়ো করে সীমান্তের দিকে হাঁটতে বাধ্য করা হয়। পরে দলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে অসুস্থ ও দিশেহারা অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন।

বর্তমানে তিনি সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নের ভাদিয়ালি গ্রামের বাসিন্দা আবুল বাশার ও তার স্ত্রী আরিফা বেগমের বাড়িতে আশ্রয়ে রয়েছেন।

‘মেয়েটার অবস্থা দেখে চোখে পানি এসে গেছে’

আশ্রয়দাতা আরিফা বেগম বলেন, তার স্বামী বেনাপোল থেকে ফেরার পথে কাদামাটি মাখা, ছেঁড়া কাপড় পরা এবং শারীরিকভাবে ভীষণ দুর্বল অবস্থায় কান্নাকাটি করতে থাকা সাইদাকে দেখতে পান।

তিনি বলেন, ‘মেয়েটার অবস্থা দেখে চোখে পানি এসে গেছে। হাত-পা ফুলে ছিল, গায়ে কাদা লেগে ছিল। সে শুধু বলছিল—চাচা, আমাকে একটু বাসায় নিয়ে যান, আমার ছোট বাচ্চা ভারতে আছে। মানবিক কারণে আমরা তাকে ঘরে তুলে নিয়েছি।’

পাঁচ দিন ধরে তারা নিজের পরিবারের সদস্যের মতোই সাইদার দেখাশোনা করছেন।

সন্তানদের জন্য মায়ের আকুতি
সাইদা জানান, তার ২৩ ও ১৪ বছর বয়সী দুই সন্তান বর্তমানে ভারতে রয়েছে। সন্তানদের কথা বলতে গিয়ে তিনি বারবার ভেঙে পড়েন।

‘আমার ছোট ছেলেটা আমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না। আমি জানি না ওরা এখন কেমন আছে। আমি শুধু আমার সন্তানদের কাছে ফিরতে চাই’—বলতে বলতেই কান্নায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।

হাইকোর্টে মামলা
সাইদার পরিবার জানিয়েছে, বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলায় অবস্থান করছেন। তাকে অবিলম্বে ভারতে ফিরিয়ে আনা এবং এই বেআইনি ‘পুশব্যাক’-এর বিচার চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) এবং পরিবারের পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির শুনানিতে সাইদা ফকিরের ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড, জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং পৈতৃক জমির দলিল আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত আদেশ দেওয়া হয়নি।

সীমান্তের ওপারে রেখে আসা প্রশ্ন
সাইদার ঘটনা সত্য হলে এটি কেবল একটি সীমান্ত-সংক্রান্ত ঘটনা নয়; এটি নাগরিক পরিচয়, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় আচরণ নিয়ে এক গভীর উদ্বেগের প্রতিচ্ছবি। দুই সন্তানের মুখ দেখার আকুতিতে কাঁদতে থাকা এই মায়ের প্রশ্ন এখন সীমান্তের কাঁটাতার ছাপিয়ে দুই দেশের মানবিক বিবেককেই নাড়া দিচ্ছে— বৈধ পরিচয় থাকা একজন মানুষ কি শুধু ভাষা ও পরিচয়ের কারণে নিজের দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারেন?
সানা/আপ্র/৩/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

স্বৈরাচারের পতন হলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি: মতিউর রহমান
০৫ অক্টোবর ২০২৬

স্বৈরাচারের পতন হলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি: মতিউর রহমান

গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের পতন হলেও দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনো নিশ্চিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন প...

রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা, আহত ১০
০৫ অক্টোবর ২০২৬

রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলা, আহত ১০

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্য...

মৃগী নদীতে ঝাঁপ, ২৬ ঘণ্টা পর মিললো শিক্ষার্থীর লাশ
০৫ অক্টোবর ২০২৬

মৃগী নদীতে ঝাঁপ, ২৬ ঘণ্টা পর মিললো শিক্ষার্থীর লাশ

শেরপুর সদর উপজেলায় নিখোঁজের প্রায় ২৬ ঘণ্টা পর মৃগী নদী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সৈয়দ সাদমান জয়...

নকল ঘি বিক্রির দায়ে প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা
০৪ অক্টোবর ২০২৬

নকল ঘি বিক্রির দায়ে প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা

চট্টগ্রাম মহানগরীতে নকল ঘি বিক্রির দায়ে এম আর কনজিউমারস প্রোডাক্টসকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আদালতে হেলমেট ছুড়ে আখতারুজ্জামান বললেন, কেন পরব

রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে নেওয়ার সময় মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক আপনি কি মনে করেন তিনি সঠিক প্রশ্ন করেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে