হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালককে হুমকি ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। তবে জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতে বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান বিচারক।
রোববার (৪ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলমের আদালতে এ ঘটনা ঘটে। এক দিনের রিমান্ড শেষে আখতারুজ্জামানকে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে বিচারক তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
শুনানির আগে দুপুর ২টা ৩৮ মিনিটের দিকে আখতারুজ্জামানকে মাথায় হেলমেট ও হাতকড়া পরিয়ে এজলাসে তোলা হয়। এর আগে থেকেই বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের উপস্থিতিতে এজলাস পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আখতারুজ্জামানকে তোলার মিনিট দুয়েক পর বিচারক জামসেদ আলম এজলাসে ওঠেন। এজলাসে দাঁড়ানো নিয়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে হট্টগোল শুরু হলে একপর্যায়ে তারা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন।
এ অবস্থায় বেলা ২টা ৪১ মিনিটের দিকে বিচারক এজলাস ছেড়ে খাসকামরায় চলে যান। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী এবং আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলে মিনিট দুয়েক পর আবার এজলাসে আসেন বিচারক।
এ সময় হাত তুলে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আখতারুজ্জামান বলেন, “আমার পক্ষে ১০ জন আইনজীবী কথা বলবেন। ১০ জনের শুনানি করার অনুমতি প্রার্থনা করছি।”
এরপর তার আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক জামিনের পক্ষে শুনানি শুরু করেন। তিনি বলেন, “তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। সবকিছুর সিটিটিভির ভিডিও আছে। শুধু মারধর করার দৃশ্য নাই। মূল ব্যাপার হলো, রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড। তিনি নতুন দলে যোগদান করেছেন। এজন্য তার বিরুদ্ধে মামলা সৃজন করা হয়েছে। তিনি অসুস্থ, ৭৩ বছর বয়স্ক লোক। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত। তার জামিন চাইছি।”
এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আখতারুজ্জামান কথা বলতে চাইলে বিচারক বলেন, “সবাই একসঙ্গে কথা বললে তো শুনতে পাব না। একজন একজন করে বলেন।”
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, “প্রতিবাদ করার ধরন আছে। ধরন যদি ঠিক না থাকে, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।” তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামীর একটি কাজ হচ্ছে উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ না করে দেশকে অস্থিতিশীল করা।
বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে দুবার কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া আখতারুজ্জামানের গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার প্রসঙ্গও শুনানিতে আসে। ওমর ফারুক বলেন, “বিএনপি বহু দলের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ নিমক খেয়ে ভুলে যায়। অন্য দলে যোগদানের জন্য মামলা দিতে হবে, এমনটা বিএনপি করে না।”
জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের উদ্দেশ করে তিনি আরো বলেন, “আমাদের মধু খেয়ে বেঁচে ছিলেন।” এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেন জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। এতে আদালতকক্ষে আবারো উত্তেজনা তৈরি হয়। ওমর ফারুক বলেন, “আপনারা রাজনীতি না আনলে আমিও আনতাম না। এমন মানসিকতা আমাদের নেই।”
আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে করা মামলার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, “উনি যে কাজ করেছেন তা অপরাধ। মামলা জামিন অযোগ্য ধারায়। প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। জামিন পেলে মামলার তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাবেন। জামিনের বিরোধিতা করছি। আর তুচ্ছ ঘটনা থেকে এমন কিছু না, আরো রহস্য আছে।”
আব্দুর রাজ্জাক এর বিরোধিতা করে বলেন, “দায়িত্বশীল পদে থেকে তার এ ধরনের বক্তব্য আশা করি না। তিনি ‘বাতিল মাল’ বলে আসামিকে মন্তব্য করেন।” তিনি বলেন, আখতারুজ্জামান জামিন পাওয়ার হকদার।
পরে ওমর ফারুক বলেন, “আখতারুজ্জামান ফ্যাসিস্টের পক্ষে গিয়ে নির্বাচন করেছেন। জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, এর ভিডিও আছে। নিজেকে বাঁচাতে জামায়াতে আশ্রয় নিয়েছে। জামায়াতে ইসলাম তাকে আশ্রয় দিয়েছে আমাদের গালাগালি করতে।”
শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে আখতারুজ্জামানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
আখতারুজ্জামানকে আদালতে হাজির করা হবে জেনে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা আদালতপাড়ায় ভিড় করেন এবং তাকে নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। শুনানি শেষে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা আদালতের নিচে গিয়ে তাদের বের করে দিতে চাইলে কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরে কয়েকজনকে মারধর করে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে জানা যায়। এ সময় জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা তাদের রক্ষা করতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
যে ঘটনায় মামলা: গত বৃহস্পতিবার মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সরবরাহে বিলম্ব এবং লাগেজ পেতে দেরি হওয়াকে কেন্দ্র করে বিমানবন্দরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ভিডিওতে সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামানকে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে উদ্দেশ করে বলতে শোনা যায়, “ঘাড় ধরে বের করে দেব, ঘাড় ধরে বের করে দেব। আপনারা কাজ করেন না, কিছু করেন না, তদবির করে পোস্ট নেন। মাইর খাইতে চান?”
মামলার এজাহারে বলা হয়, ১ অক্টোবর সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ জন প্রতিনিধি সপরিবারে মদিনা থেকে ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে তখন আগমনী যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় ট্রলি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
অভিযোগে বলা হয়, কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভেঙে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। পরে লাগেজ আসতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি না পাওয়াকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং অশোভন আচরণ করেন।
এর মধ্যে বেলা পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান। রাগীব সামাদ সেখানে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং গালিগালাজ করেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, নির্বাহী পরিচালক অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করলেও আখতারুজ্জামান আরো উত্তেজিত হয়ে বলেন, “আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা”, “গেইট আউট ফ্রম হিয়ার”, “ঘাড় ধরে বের করে দিব”, “কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিং এ আসবেন”, “মাইর খাইতে চান?”
আখতারুজ্জামানের আচরণে পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর আখতারুজ্জামান উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে হুমকি দেন বলেও মামলার বিবরণে অভিযোগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আপনাদের সবাইকে বিমানবন্দরে বেঁধে পিটানো এবং সোশাল মিডিয়ায় দেওয়া দরকার, যাতে তারেক রহমান এটি দেখেন, তখন আপনারা সোজা হবেন। আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেব।”
এ ঘটনায় শুক্রবার ভোরে বিমানবন্দর থানায় মামলা করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা কর্মকর্তা শাহরিয়ার আলম সজিব।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরদিন শনিবার তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
রোববার রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার এসআই মাজেদুল ইসলাম। আবেদনে বলা হয়, এক দিনের রিমান্ডে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার ঘটনা সম্পর্কে তাকে ব্যাপক ও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মামলার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং কিছু তথ্য দিয়েছেন। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত থাকায় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
সানা/আপ্র/৪/১০/২০২৬