সর্বজনীন পেনশন স্কিমে পেনশনারের মৃত্যুর পর নমিনি বা স্বামী-স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে পেনশন গ্রহণের বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভা শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান। সভায় সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের বিনিয়োগ থেকে ১১ শতাংশের বেশি মুনাফা হয়েছে। চূড়ান্ত হিসাবে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭২ শতাংশের বেশি বলে সভায় জানানো হয়েছে এবং এ মুনাফা অনুমোদনও করা হয়েছে।
শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম
শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম সম্পর্কে ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ইসলামিক সংস্করণ অনুমোদন হয়েছে। এটি চালু করা হবে।
তিনি জানান, শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতি নির্ধারণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে বিধিমালা প্রণয়নের পর এটি চালু করা হবে।
৫৫ বছর বয়সে পেনশন নয়
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে পেনশন শুরুর বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়ে আলোচনা হলেও এ বিষয়ে সভায় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান ড. সুরাতুজ্জামান।
তিনি বলেন, ৫৫ বছরের বিষয়টি আপাতত সিদ্ধান্ত হয়নি। অ্যাকচুয়ারিয়াল বিজ্ঞানে নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পরিচালনা পর্ষদের সভায় বিষয়টি আবার উপস্থাপন করা হতে পারে।
বর্তমানে পেনশন শুরুর বয়স ৬০ বছরই রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে পেনশন শুরুর বয়স ৬২, ৬৬ বা ৬৭ বছর। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
নমিনির পেনশন ৮০ বছর পর্যন্ত
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে পেনশনারের মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী, স্ত্রী বা নমিনি পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগে ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাওয়ার বিধান থাকলেও তা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে।
ড. মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, পেনশনার আজীবন পেনশন পাবেন। আর নমিনি বা স্বামী-স্ত্রী ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাবেন। সাধারণত স্ত্রী বা স্বামীকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ঋণ কার্যক্রমে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি
সর্বজনীন পেনশন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, কীভাবে ঋণ দেওয়া হলে তহবিলের অর্থে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা নিশ্চিত করা যাবে এবং সুদের হার বা অন্যান্য শর্ত কী হবে, এসব বিষয় আরও পর্যালোচনা করা হবে।
অ্যাকচুয়ারিয়াল নির্দেশনা ও মানদণ্ড নির্ধারণের পর ঋণ কার্যক্রম চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই লক্ষ্যেই ঋণ দেওয়ার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হবে।
নিবন্ধনে প্রণোদনা বাড়ছে
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নতুন নিবন্ধন বাড়াতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রণোদনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ড. সুরাতুজ্জামান জানান, আগে একজনকে নিবন্ধনের জন্য এসব প্রতিষ্ঠান ১৫ টাকা করে পেত। এখন তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৫ টাকা খুবই সামান্য। প্রণোদনার পরিমাণ বাড়লে এসব প্রতিষ্ঠান আরও বেশি নিবন্ধন করানোর চেষ্টা করবে। এতে নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়বে।
স্বাস্থ্যবিমা চালুর আগে বিশ্লেষণ
সর্বজনীন পেনশনের আওতায় স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে কী ধরনের কাঠামোয় এটি চালু করা হবে, এতে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি বা ঝুঁকি কতটা হতে পারে এবং কীভাবে তা মোকাবিলা করা হবে—এসব বিষয়ে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ করা হবে।
এরপর সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে স্বাস্থ্যবিমার কাঠামো নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মুনাফা দেওয়ার বিষয়েও এখনই কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তহবিলের পরিধি আরও বাড়লে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সরকারি কোম্পানির কর্মীরা আসবেন প্রগতি স্কিমে
ডাক বিভাগ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরতদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রগতি’ স্কিমের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, বর্তমানে যেসব সরকারি কোম্পানির কর্মীরা কোনো পেনশন স্কিমের আওতায় নেই, তাঁদের প্রগতি স্কিমে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘প্রত্যয়’ স্কিম নিয়ে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি আলাদা বিষয়। ওই স্কিম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রবাসী কর্মীদের স্কিমে আনার উদ্যোগ
বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের সর্বজনীন পেনশনের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে জানানো এবং নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের প্রস্থান-পূর্ব ওরিয়েন্টেশনের সময় সর্বজনীন পেনশনের বিভিন্ন স্কিম সম্পর্কে তথ্য দেওয়া হবে। এ জন্য লিফলেটও সরবরাহ করা হবে।
তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে তাঁদের হাতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়া এবং সর্বজনীন পেনশনের সুবিধাগুলো সম্পর্কে জানানো হবে। সরকারি ব্যবস্থায় বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসী স্কিমের আওতায় আনার বিষয়ে একটি শর্ত রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বেসরকারি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষা
সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের আর্থিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করতে একটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, সরকারি নিয়মে সাধারণ নিরীক্ষার পাশাপাশি নির্বাচিত বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিরীক্ষা করানো হবে। এতে হিসাব ও কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এসি/আপ্র/১৭/৯/২০২৬