সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তার স্ত্রীর দেশ-বিদেশের সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগের তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি কেনা, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে এসব তথ্য চাওয়া হয়েছে।
দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জাহেদ কালামের সই করা চিঠির সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুদকের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিএফআইইউকে দেওয়া চিঠিতে আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর নামে দেশের সব ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা চালু, সুপ্ত ও বন্ধ হিসাবের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, লকার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, ডিপিএস এবং ঋণসংক্রান্ত নথিপত্রও চাওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি কেনা, অর্থপাচার ও শেল কোম্পানি গঠনের অভিযোগসংক্রান্ত দলিল ও রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে। ওই পাঁচ দেশে তাঁদের কোনো ব্যাংক হিসাব বা বিনিয়োগ রয়েছে কি না, বিদেশি সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে সংগৃহীত সে-সংক্রান্ত তথ্যও দিতে বলা হয়েছে।
চিঠিতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে দায়িত্ব পালনকালে অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থপাচার, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং বিদেশে শেল কোম্পানি গঠনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি। দুদক এসব অভিযোগের অনুসন্ধান করছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধানাধীন অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধান পরিচালনার জন্য দুদকের উপপরিচালক মো. জাহেদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়।
অভিযোগ অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে চার ধরনের নথি তলব করে দুদক। এরই মধ্যে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ে সম্পাদিত নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুদকে পৌঁছেছে।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য ও অর্থপাচারসহ নতুন একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। নতুন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের টেন্ডার এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বিশ্বের পাঁচ দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদের দুই বোনজামাই ও এক ভাগ্নেকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পাচার করা অর্থের মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাঠিয়ে বিলাসবহুল ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রিন গ্রুপে’ মূলধন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনার অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ গ্রহণ, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে ঘুষের মাধ্যমে নিয়োগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগের বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়াতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বাবা বিল্লাল হোসেন ও ব্যক্তিগত সহকারী মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনের তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস ও গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদ ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও কর্মকর্তার নাম এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি দাবি করেছিলেন, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে তার মানহানি করা হয়েছে। পরে গত ১০ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে আইনি নোটিশও দেওয়া হয়। তবে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আইন ও বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে।
দুদক জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ম অনুযায়ী অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর দুদক সচিবও বলেন, অনুসন্ধানটি কোনো চাপ, পক্ষপাতিত্ব বা নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে করা হচ্ছে না।
এসি/আপ্র/১৭/৯/২০২৬