রান্নার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), কিন্তু সেই দামে সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না ভোক্তারা। বাজারে গেলে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, কোথাও কোথাও তারও বেশি দিতে হচ্ছে। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে বাড়তি দাম আদায়ের অভিযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি বিক্রেতাদের দাবি, তাঁরাও কোম্পানি ও ডিলারদের কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনছেন। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ঘোষিত মূল্য আর বাস্তব বাজারদরের মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান। এর চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ পরিবার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর।
সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর ১২ কেজি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। নতুন দর ওই দিন রাত ৮টা থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ৪ অক্টোবর একই সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার তুলনায় বর্তমান দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। অথচ দাম বাড়ানোর পরও বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। বরং নতুন দর কার্যকর হওয়ার পর ভোক্তাদের ব্যয় আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দাম বাড়লেও মিলছে না নির্ধারিত দরে: রাজধানীর মিরপুর, আগারগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে এখনো ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরবরাহ ও কোম্পানিভেদে দাম আরো বেশি। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত ২ হাজার ৬০ টাকার সঙ্গে বাস্তবে ক্রেতাদের ব্যয়ের ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে কয়েক শ টাকা।
খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আহমেদ সোহেল স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে তিন সদস্যের পরিবারে প্রতি মাসে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। তাঁর অভিযোগ, আগে সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮০০ টাকার আশপাশে থাকলেও তাঁকে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। এখন দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণের পর বাজারে কিনতে গেলে আড়াই হাজার টাকার বেশি চাইতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে রান্নার গ্যাসের দামও এভাবে বাড়তে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
শুধু গৃহস্থালি নয়, এলপিজির বাড়তি দাম ক্ষুদ্র ব্যবসার হিসাবও পাল্টে দিচ্ছে। মিরপুর-২ নম্বর এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী মো. শহিদুল ইসলাম জানান, তাঁর দুটি চুলায় রুটি ও পরোটা তৈরির জন্য দুটি সিলিন্ডার ব্যবহার হয়। তিন দিন পরপর দুটি সিলিন্ডার বদলাতে হয়। আগে সরকারি দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়েই গ্যাস কিনতে হতো। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর খরচ আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
শহিদুলের হিসাবে, গ্যাসের পাশাপাশি ময়দাসহ অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। অথচ ক্রেতাদের কথা বিবেচনা করে একটি পরোটা ১০ টাকায় বিক্রি করছেন। বর্তমান ব্যয়ে এই দামে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্যাস ও উপকরণের দাম বাড়তে থাকলে পরোটার দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকবে না; তাতেও ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, এভাবে চলতে থাকলে ছোট হোটেল ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হবে।
আগারগাঁওয়ের চা বিক্রেতা ফখরুদ্দীনও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাঁর ২ হাজার ৩০০ টাকা লেগেছে। সেটি দিয়ে ১১ থেকে ১৩ দিন চলে। নতুন দাম ঘোষণার পর বিক্রেতারা ২ হাজার ৫০০ টাকার মতো চাইতে পারেন বলে তাঁর আশঙ্কা। চায়ের দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যেতে পারেন, তাই অন্য পণ্যের বিক্রি থেকে গ্যাসের বাড়তি ব্যয় পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
সরবরাহ সংকটের পেছনে আমদানির জটিলতা: বাজারে এলপিজির সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে আমদানি, ঋণপত্র খোলা এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার বিষয় উঠে এসেছে। বিদেশ থেকে এলপিজি আমদানির জন্য আমদানিকারকদের ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র খুলতে হয়। কিন্তু কয়েকটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে জটিলতায় পড়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শতভাগ নগদ জামানত দেওয়ার শর্ত, ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতা এবং কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত জটিলতার কারণে আমদানিতে বাধা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বাজারের সরবরাহে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে এলপিজি আমদানি আগের মাসের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমে যায়। আবার বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের দাবি, দেশে মোট চাহিদার তুলনায় আমদানির পরিমাণ খুব বেশি কম না হলেও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়ায় সরবরাহের ভার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছে। ফলে যেসব কোম্পানির সিলিন্ডার বাজারে নিয়মিত আসছে না, সেসব ব্র্যান্ডের গ্রাহকেরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
অন্যদিকে, সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে বাড়তি ব্যয় ও কমিশন নিয়ে বিরোধের কথাও সামনে এসেছে। আমদানিকারক থেকে ডিলার, এরপর খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে সিলিন্ডার ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। এই ধারাবাহিকতায় কোনো পর্যায়ে সরবরাহ কমে গেলে বা বাড়তি দাম নেওয়া হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ক্রেতার ওপর পড়ে। ডিলার পর্যায়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি এবং খুচরা বিক্রেতাদের বাড়তি মুনাফা যোগ করার অভিযোগও রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, তাঁদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে; পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিক্রেতারাও পড়েছেন চাপের মুখে: মিরপুর-৬ নম্বর এলাকার সাফোয়ান এন্টারপ্রাইজের বিক্রেতা মো. মামুন জানান, তাঁর দোকানে বর্তমানে পেট্রোম্যাক্স, ইউনিগ্যাস ও আইগ্যাসের ১২ কেজির সিলিন্ডার রয়েছে। কোম্পানিভেদে গ্যাসসহ নতুন সিলিন্ডারের দাম ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা। খালি সিলিন্ডারে গ্যাস ভরার ক্ষেত্রেও দামের পার্থক্য রয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইউনিগ্যাসের ১২ কেজির সিলিন্ডার রিফিল করতে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং পেট্রোম্যাক্স ও আইগ্যাসের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৩০০ টাকা লাগে।
মামুনের দাবি, একটি সিলিন্ডার কিনতেই তাঁদের প্রায় ২ হাজার ৩০০ টাকা খরচ হচ্ছে। এরপর ১০০ থেকে ১৫০ টাকা লাভ রেখে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু ক্রেতারা সরকারি নির্ধারিত দামের সঙ্গে তুলনা করে বাড়তি টাকা দিতে চান না। এতে বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে প্রায়ই বিরোধ তৈরি হচ্ছে। আবার এক কোম্পানির খালি বোতল দিয়ে অন্য কোম্পানির গ্যাস নেওয়া বা বোতল বিনিময় করা যায় না। ফলে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার না পেলে ক্রেতাদের নতুন করে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
নিয়ন্ত্রণহীন বাজারে প্রশ্ন তদারকি নিয়ে: এলপিজির দাম নির্ধারণের দায়িত্ব বিইআরসির হলেও ঘোষিত দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কি না, সরবরাহব্যবস্থা কতটা স্বাভাবিক এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কি না - এসব প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। শুধু নতুন দাম ঘোষণা করলেই ভোক্তার স্বস্তি নিশ্চিত হয় না। নির্ধারিত দামে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার বাজারে পৌঁছানো এবং প্রতিটি পর্যায়ে মূল্যতালিকা কার্যকর করা জরুরি।
এ জন্য আমদানিকারকদের প্রকৃত আমদানি ও মজুতের হিসাব প্রকাশ, কোম্পানিভিত্তিক সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং ডিলার-খুচরা বিক্রেতার বিক্রয়মূল্য যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরবরাহ সংকটের সুযোগে কেউ অতিরিক্ত মুনাফা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। ব্যবসায়ীদের পরিবহন ও কমিশনসংক্রান্ত যৌক্তিক দাবিও তথ্যের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা দরকার।
রান্নার গ্যাস এখন শহরের অসংখ্য পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি। ক্ষুদ্র হোটেল, রেস্তোরাঁ ও চায়ের দোকানের মতো বহু জীবিকার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই এলপিজির বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি জনজীবনের ব্যয় ও ক্ষুদ্র অর্থনীতির সুরক্ষার সঙ্গেও জড়িত। নির্ধারিত দাম আর বাস্তব বাজারদরের ব্যবধান দূর করতে না পারলে প্রতি মাসে নতুন দাম ঘোষণার পরও ভোক্তার ভোগান্তি কমবে না।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৪/১১/২০২৬