প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপির দায়ে থাকা দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে নতুন করে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রুপটির পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে চলতি মূলধন জোগাতে সিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট ঋণের আওতায় এ অর্থ দেওয়া হবে। এ জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান থেকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে গঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিটি গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে এ ঋণ সুবিধা দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-সিটি সিড ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি এডিবল অয়েল লিমিটেড, সিটি ডাল মিলস ও শম্পা ফ্লাওয়ার মিলস।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সচল রাখতে নতুন করে চলতি মূলধন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী রমজানে বাজারে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই ডজনের বেশি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পর সিটি গ্রুপের ঋণখেলাপির পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ভোগ্যপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনাকারী শিল্পগোষ্ঠীটি আর্থিক চাপে পড়েছে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরে সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ না করার নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে গ্রুপটিকে পুনরুদ্ধারে ব্যাংকগুলোকে নতুন ঋণ দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। তবে সব ব্যাংক এ প্রস্তাবে সম্মত না হওয়ায় গত সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে বৈঠক করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ওই বৈঠকে ঋণখেলাপি হিসেবে শ্রেণীকরণ নিয়ে ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দেয়। এরপর আগের অবস্থান থেকে সরে এসে ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথ বেছে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে সিটি গ্রুপের ঋণ কয়েকটি ব্যাংকের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট ঋণে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে সিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের সিদ্ধান্ত হলো।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৭কক (৩) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান নতুন করে ঋণ সুবিধা দিতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাড়ের ফলে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে ঋণ বিতরণ ও অর্থ ব্যবহারে বেশ কিছু শর্ত আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে নতুন করে জামানত নিতে হবে। ঋণের অর্থ দিয়ে কেনা পণ্য বিক্রির পর প্রাপ্ত অর্থ নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হবে। সেখান থেকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলো আনুপাতিক হারে কিস্তি আদায় করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ঋণের আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সিকিউরিটি এজেন্টের প্রতিনিধি হিসেবে কিনবে এবং জিম্মাদার হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করবে। অর্থাৎ পণ্য আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের পুরো ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে। প্রয়োজনে তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে।
ঋণের অর্থ অন্য কোনো খাতে ব্যবহার বা অন্যত্র স্থানান্তর করা যাবে না। পুরো অর্থ ও পণ্য ব্যবস্থাপনা ব্যাংকগুলোর নজরদারিতে থাকবে বলেও জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, প্রস্তাবিত ঋণ সুবিধার বিপরীতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো দায় সৃষ্টি হবে না। ভবিষ্যতে সিটি ব্যাংক কিংবা সিন্ডিকেটের অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকারের বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না।
সানা/আপ্র/৪/১১/২০২৬