দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বাজার অংশীদারত্বও। প্রধান পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার হারিয়েছে বাংলাদেশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি হয়েছে ৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ইউরো। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রফতানি আয় কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ইউরো।
একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানি কমেছে তার প্রায় দ্বিগুণ হারে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। একই সময়ে দেশটির রফতানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ফলে চীনের বাজার অংশীদারত্ব ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
নিটওয়্যার ও ওভেন—দুই খাতেই সংকটের চিত্র স্পষ্ট। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে নিটওয়্যার রফতানি কমেছে ২০ দশমিক ১ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রফতানি কমেছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট কোনো পণ্য নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাত চাপের মুখে রয়েছে।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। জানুয়ারিতে রফতানি কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি। ফেব্রুয়ারিতে পতনের হার কিছুটা কমলেও মার্চ ও এপ্রিলে তা যথাক্রমে ১৯ দশমিক ২ এবং ১৯ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায়।
শুধু রফতানির পরিমাণই নয়, কমেছে পোশাকের গড় মূল্যও। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে রফতানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে রফতানি পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ রফতানিকারকদের আগের তুলনায় কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদের হার, যুদ্ধ পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ নানা সীমাবদ্ধতা রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সমিতির সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, রফতানি কমার পাশাপাশি ইউনিট মূল্যও কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের মূল্যসংযোজনকারী পণ্যে জোর দিলে হারানো বাজার পুনরুদ্ধার সম্ভব।
এদিকে একই সময়ে ভিয়েতনামের রফতানি কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে দেশটির বাজার অংশীদারত্ব বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা ভিয়েতনামকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
পাকিস্তানের রফতানি কমেছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ, তুরস্কের ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ভারতের ১২ দশমিক ১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৯ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের বিদ্যমান শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকবে না। ফলে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন, বন্দর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে না পারলে ভবিষ্যতে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ইউরোপের বাজারে রফতানি, বাজার অংশীদারত্ব ও গড় মূল্য—তিন ক্ষেত্রেই একযোগে পতনকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রফতানি খাতের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সানা/আপ্র/২০/৬/২০২৬