পারস্য উপসাগরের অস্থির জলসীমায় প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে আটকে থাকা বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ এখন হরমুজ প্রণালির একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করছে। তবে প্রণালি অতিক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি না পাওয়ায় জাহাজটি এখনো চূড়ান্ত যাত্রা শুরু করতে পারেনি।
জাহাজটি বর্তমানে অবস্থান করছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরের বহির্নোঙরে। সেখান থেকে হরমুজ প্রণালির দূরত্ব প্রায় ৮০ নটিক্যাল মাইল। অনুমতি মিললে জাহাজটি প্রণালি পার হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে যাত্রা করবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)।
বিএসসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জাহাজটি বর্তমানে প্রণালির কাছাকাছি অপেক্ষমাণ রয়েছে এবং অনুমতি পেলে অতিক্রম করবে। তাঁর ভাষায়, প্রণালি পার হতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং ইরানি নৌবাহিনীর অনুমোদন প্রয়োজন।
তিনি আরো জানান, জাহাজের ৩১ জন নাবিকের সবাই সুস্থ আছেন এবং তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
জাহাজটির ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী প্রণালিটি এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ পার হতে পারছে না। ফলে তারা এখন অপেক্ষায় রয়েছেন।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী জানান, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে অনুমতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অপেক্ষমাণ জাহাজের চাপ-এই তিনটি বিষয় বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে চ্যানেলে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও মাইন থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে বড় আকারের জাহাজ চলাচলের জন্য চ্যানেল পুরোপুরি নিরাপদ ও প্রশস্ত না হওয়ায় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, প্রণালিতে অপেক্ষমাণ জাহাজের সংখ্যা কয়েকশ। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৫৫০টি জাহাজ বর্তমানে অপেক্ষায় রয়েছে, যার কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।
ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী আরো বলেন, সব মিলিয়ে প্রণালি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জাহাজটিতে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রেই অবস্থান করছেন। তাদের মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে একাধিকবার প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় ‘বাংলার জয়যাত্রা’। গত ফেব্রুয়ারিতে জেবেল আলী বন্দরে ভেড়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরু হলে জাহাজটির পরিকল্পিত রুট বারবার পরিবর্তন করতে হয়।
বর্তমানে জাহাজটিতে প্রায় ৩৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন সার রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এটি দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে।
অস্থির হরমুজ প্রণালির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘বাংলার জয়যাত্রা’ যেন এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির জটিলতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি-যেখানে সমুদ্রপথের একটি জাহাজও যুদ্ধ, কূটনীতি ও নিরাপত্তা সমীকরণের বন্দি হয়ে পড়ে।
সানা/আপ্র/১৯/৬/২০২৬