প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি, উন্নয়ন অংশীদারত্ব ও আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দুই দেশের শীর্ষ বৈঠক, যৌথ ঘোষণা, সমঝোতা স্মারক, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উদ্যোগ সফরের উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি। তবে এসব অর্জনের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। জাপান বাংলাদেশ থেকে বছরে এক লাখ কর্মী নেওয়ার সম্মতি দেয়নি। এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে নাকচ করেছে। ফলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার পার্থক্য বজায় রেখে সফরের অর্জন মূল্যায়ন করা জরুরি।
সফরের অন্যতম বড় প্রাপ্তি আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং এর মাধ্যমে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রত্যাশা। পাশাপাশি দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতার আওতায় প্রায় ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুটি উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ২৯ কোটি ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতিও এসেছে। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং উপকূলীয় নিরাপত্তায় সহযোগিতার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সম্ভাব্য বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা এবং নিশ্চিত অর্থপ্রাপ্তি এক বিষয় নয়। বিশেষ করে দুই লাখ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য জাপানে দুই লাখ চাকরির নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে বছরে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে জাপানের সম্মতি পাওয়ার খবরও সঠিক নয়। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবরের দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এই স্পষ্টীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতিরঞ্জিত প্রচার সাধারণ মানুষের মধ্যে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে এবং বিদেশে কর্মসংস্থানপ্রত্যাশীদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
সরকারের উচিত বিদেশে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আনুষ্ঠানিক সম্মতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখা। জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের সুযোগ রয়েছে, তবে ভাষাগত দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পেশাগত যোগ্যতা ও নির্দিষ্ট নিয়োগপ্রক্রিয়া পূরণ করতে হয়। ২০১৯ সালে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে সহযোগিতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগকে বাস্তব কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া। জাপানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি, জাপানি ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও ভুয়া নিয়োগের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
সফরের আরেকটি সুদূরপ্রসারী দিক হলো বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে নতুন মাত্রায় এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে মাতারবাড়ী-মহেশখালী অঞ্চলকে জ্বালানি, শিল্প ও আঞ্চলিক পণ্য সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে। নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখা অপরিহার্য। অবকাঠামো নির্মাণ, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যয় ভাগাভাগির বিষয়গুলো প্রতিটি চুক্তিতে সুস্পষ্ট থাকতে হবে। অন্য দেশের বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে বাংলাদেশ যেন অসম আর্থিক দায়ের মুখে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার অঙ্গীকারও গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এ চুক্তি সহায়ক হতে পারে। তবে দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। জাপানি বিনিয়োগের সুফল যেন শুধু অবকাঠামো বা উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষেও অবদান রাখে।
এ জন্য সরকারের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, স্বাক্ষরিত চুক্তি ও বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সময়সীমাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অনুমোদনপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, কর ও শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। তৃতীয়ত, জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, জাপানে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান ও নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, মাতারবাড়ী বন্দর, বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ও মেট্রোরেল প্রকল্পে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাপানের সমর্থনও বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।
জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার। এই সম্পর্ককে ঋণ, অনুদান কিংবা বিনিয়োগের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনশীল অর্থনীতি, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তি ও টেকসই কর্মসংস্থানের অংশীদারত্বে রূপ দিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো সম্ভাবনাকে নিশ্চিত প্রাপ্তি হিসেবে প্রচার না করে জনগণের সামনে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার দৃশ্যমান সুফলের মধ্য দিয়ে।
সানা/আপ্র/৩১/১০/২০২৬