গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬

মেনু

জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার বিপজ্জনক অশনিসংকেত

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:৫৯ পিএম, ০৩ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৪:১৪ এএম ২০২৬
জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার বিপজ্জনক অশনিসংকেত
ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানীর রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে না, শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত, সিএনজি স্টেশনে রাতভর অপেক্ষা, আর বিদ্যুৎ গ্রিডে বাড়ছে চাপ-এ দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন খাতগত সমস্যার প্রতিচ্ছবি নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতার গভীর সংকেত। মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড-পরবর্তী কারিগরি ত্রুটির কারণে মাত্র পাঁচ দিনে আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসা দেশের জ্বালানি কাঠামোর দুর্বলতাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে।

বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট। এই বিপুল ঘাটতির সরাসরি অভিঘাত পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে, আর ব্যয়বহুল কয়লা ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভর্তুকির চাপ বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করবে।

তবে এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর বহুমাত্রিক প্রভাব। আবাসিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা ও এলপিজির দিকে ঝুঁকছে, ফলে বিদ্যুতের ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। এলপিজির চাহিদা বাড়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট ও অতিরিক্ত দামের অভিযোগ উঠছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি দ্বিগুণ দুর্ভোগ-না আছে পর্যাপ্ত গ্যাস, না আছে সাশ্রয়ী বিকল্প জ্বালানি।

শিল্প খাতে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। তৈরি পোশাক, বস্ত্র, সিরামিক, গ্লাস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু কারখানার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; রপ্তানি আদেশ, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, শ্রমিক কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও তা নেতিবাচক অভিঘাত সৃষ্টি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি অর্থনৈতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।

পরিবহন খাতেও সংকটের প্রতিফলন স্পষ্ট। হাজার হাজার সিএনজি চালক প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে গ্যাসের লাইনে অপেক্ষা করছেন। এতে শুধু তাদের আয় কমছে না; জাতীয় অর্থনীতির বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যাত্রী ভোগান্তি বাড়ছে, ভাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে, পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি এক ধরনের ‘নীরব রক্তক্ষরণ’, যার প্রভাব ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি ও বাজার অস্থিতিশীলতার দিকে গড়াতে পারে।

এই পরিস্থিতি মূলত একটি বড় কাঠামোগত সত্যকে সামনে এনেছে-বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা ক্রমেই অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। একসময় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন যেখানে প্রায় ২৮০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি ছিল, সেখানে এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুটে। ফলে একটি মাত্র এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় পর্যায়ে বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। এটি কোনো সাময়িক দুর্ঘটনার ফল নয়; দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগত সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।

অতএব, কেবল বিকল টার্মিনাল মেরামত করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল-বিকল্প এলএনজি গ্রহণ সক্ষমতা, কৌশলগত গ্যাস মজুত, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন বিনিয়োগ, পাইপলাইন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং সর্বোপরি জ্বালানি খাতে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বর্তমান সংকটকে যদি শুধুই সাময়িক ভোগান্তি হিসেবে দেখা হয়, তবে তা হবে ভয়াবহ আত্মপ্রবঞ্চনা। এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন, নগরজীবন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এক কঠোর সতর্কবার্তা। এখনই দূরদর্শী, সমন্বিত ও সাহসী নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতের সংকট আরো গভীর, আরো ব্যয়বহুল এবং আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। নিশ্চয়ই আমরা কেউ-ই তা প্রত্যাশা করি না।
সানা/আপ্র/৩/৮/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

বাংলাদেশ কারও দয়া নয়, সবার সমঅধিকার
০২ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশ কারও দয়া নয়, সবার সমঅধিকার

রাজধানীর কাকরাইলে সম্মিলিত সনাতন পরিষদ আয়োজিত ‘সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান’ শীর্ষক মতবিনি...

আস্থার সংকট কাটাতে কওমি শিক্ষায় স্বচ্ছতার বিকল্প নেই
০১ আগস্ট ২০২৬

আস্থার সংকট কাটাতে কওমি শিক্ষায় স্বচ্ছতার বিকল্প নেই

শিক্ষা কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। আর যে শিক্ষা মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মানবিকতা...

মানবপাচার রোধে আইন প্রয়োগ দ্রুত নিশ্চিত প্রয়োজন
৩০ জুলাই ২০২৬

মানবপাচার রোধে আইন প্রয়োগ দ্রুত নিশ্চিত প্রয়োজন

একবিংশ শতাব্দীতেও মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য অপরাধ মানবসভ্যতার কপালে এক কলঙ্কের তিলক হয়ে বিঁধে আছে। এটি ক...

শিশুস্বাস্থ্যের সঙ্গে মুনাফার নির্মম আপস আর নয়
৩০ জুলাই ২০২৬

শিশুস্বাস্থ্যের সঙ্গে মুনাফার নির্মম আপস আর নয়

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পরিবার বছরের পর বছর ধরে যে শিশুপণ্যকে নিরাপত্তা, কোমলতা ও মাতৃত্বের আস্থার প্রতী...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বেনজীরকে ফেরাতে দুবাইয়ে আইনি লড়াই শুরু সরকারের

দুবাইয়ে শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্ত সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আইনি প্রক্রিয়া জোরদার করেছে সরকার। তার জামিন আদেশ বাতিলের উদ্যোগ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একটি আইনজীবী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন- বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 12 ঘন্টা আগে