পাখির কিচিরমিচিরের ভাষা বিশ্লেষণ করে তাদের বিভিন্ন ডাকের অর্থ উন্মোচনের স্বীকৃতি হিসেবে এক লাখ ডলারের আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছেন মার্কিন বিজ্ঞানী ড. জুলি এলি। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিচালিত তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে, জেব্রা ফিঞ্চ পাখিরা কীভাবে নির্দিষ্ট শব্দের মাধ্যমে নিজেদের পরিচয়, কার্যকলাপ এবং পারস্পরিক যোগাযোগের তথ্য আদান-প্রদান করে।
এই গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ড. জুলি এলিকে এ বছরের ‘কলার-ডুলিটল দ্বিমুখী আন্তঃপ্রজাতি যোগাযোগ পুরস্কার’ দেওয়া হয়েছে। প্রাণী কল্যাণ ও প্রাণীদের অনুভূতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ‘জেরেমি কলার ফাউন্ডেশন’ এবং ‘তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়’ যৌথভাবে ২০২৪ সালে এ পুরস্কার চালু করে। পাশাপাশি মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে কার্যকর দ্বিমুখী যোগাযোগের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য ফাউন্ডেশনটি এক কোটি ডলারের বিশেষ পুরস্কারও ঘোষণা করেছে।
গবেষণায় ড. এলি দেখিয়েছেন, জেব্রা ফিঞ্চ পাখিরা অন্তত ১১টি মৌলিক ধরনের ডাক ব্যবহার করে। এসব ডাকে তারা নিজেদের পরিচয় জানায়, কী করছে তা প্রকাশ করে এবং কণ্ঠস্বরের স্বাতন্ত্র্যের ভিত্তিতে একে অপরকে শনাক্ত করতে পারে। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, একই ধরনের শব্দের তুলনায় কাছাকাছি অর্থবোধক ভিন্ন শব্দ নিয়ে পাখিরা বেশি বিভ্রান্ত হয়।
ড. জুলি এলি বলেন, এই সম্মাননায় তিনি গর্বিত। প্রাণীদের সঙ্গে মানুষের অর্থপূর্ণ যোগাযোগ স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টায় তাঁর গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পুরস্কারের বিচারক প্যানেলের চেয়ারম্যান ও প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ইয়োসি ইয়োভেল বলেন, প্রাণীদের ভাষা বোঝার গবেষণায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
গবেষণার জন্য ড. এলি জেব্রা ফিঞ্চ পাখিকে বেছে নেন, কারণ এরা অত্যন্ত বেশি কিচিরমিচির করে। এতে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব পাখির বিভিন্ন ধরনের ডাক রেকর্ড করেন এবং পরিস্থিতি ও আচরণের ভিত্তিতে সেগুলো আলাদাভাবে শ্রেণিবদ্ধ করেন।
পরে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির সাহায্যে তিনি বিশ্লেষণ করেন, এসব ডাকে কী ধরনের তথ্য লুকিয়ে আছে। গবেষণার ফল যাচাই করতে তিনি কয়েকটি আচরণগত পরীক্ষাও পরিচালনা করেন। এক পরীক্ষায় পাখিদের একটি বোতাম চাপার মাধ্যমে বিভিন্ন পরিচিত ডাক শোনানো হয়। নির্দিষ্ট ধরনের ডাকের পর তাদের খাবার দেওয়া হতো। ধীরে ধীরে পাখিগুলো বুঝে যায়, কোন ডাকের পর খাবার মিলবে না এবং সেগুলো বোতাম চেপে এড়িয়ে যেতে শেখে।
ড. এলির মতে, এই আচরণ অনেকটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ অনাকর্ষণীয় ভিডিও এড়িয়ে যাওয়ার মতো। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, পাখিদের মস্তিষ্কে নিজেদের বিভিন্ন ধরনের ডাকার অর্থ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে।
বিচারক প্যানেলের সদস্য অধ্যাপক জোনাথন বার্চ বলেন, প্রায় ১৫ বছরের গবেষণায় ড. এলি শুধু জেব্রা ফিঞ্চের ১১টি মৌলিক ডাকার একটি অভিধানই তৈরি করেননি, বরং পরীক্ষার মাধ্যমে পাখিদের কাছ থেকেই সেই ব্যাখ্যার যথার্থতা যাচাই করেছেন। হাজার হাজার রেকর্ড করা ডাক বিশ্লেষণ করে তাদের অর্থ উন্মোচনের ক্ষেত্রে এটি একটি অসাধারণ গবেষণা।
এবারের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আরো ছিল আফ্রিকান ডোরাকাটা ইঁদুর, বনোবো শিম্পাঞ্জি এবং আইভরি কোস্টের শিম্পাঞ্জিদের যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে পরিচালিত কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে প্রাণীদের ভাষা বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যতে মানুষের সঙ্গে তাদের অর্থপূর্ণ যোগাযোগের সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
সানা/আপ্র/২৯/৬/২০২৬