‘টিউমার’ শব্দটি শুনলেই অনেকের মনে উদ্বেগ তৈরি হয়। আর তা যদি মস্তিষ্কে হয়, তাহলে শঙ্কা আরও বেড়ে যায়।
ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত রোগীদের প্রায়ই নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। চলাফেরায় সমস্যা, স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির অবনতি, আবেগজনিত পরিবর্তন, খিঁচুনি, গিলতে অসুবিধা এবং দীর্ঘস্থায়ী মাথাব্যথার মতো উপসর্গ এ রোগে সাধারণভাবে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেন টিউমার যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। তবে কিছু নির্দিষ্ট কারণ ও শারীরিক অবস্থার কারণে কারও কারও ক্ষেত্রে এ রোগের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।
ব্রেন টিউমার কী?
ব্রেন টিউমার হলো মস্তিষ্কের ভেতরে বা এর আশপাশে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি। এটি ক্যানসারজনিত কিংবা অক্যানসারজনিত—উভয় ধরনের হতে পারে। সহজ ভাষায়, মস্তিষ্কে সৃষ্ট অস্বাভাবিক কোষগুচ্ছ বা ক্ষতকেই ব্রেন টিউমার বলা হয়। এই টিউমার মস্তিষ্কের ভেতরে অতিরিক্ত জায়গা দখল করে আশপাশের টিস্যুর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কে থাকা তরলের স্বাভাবিক প্রবাহেও বাধা সৃষ্টি করে, যা বিভিন্ন জটিলতা ডেকে আনতে পারে। কিছু টিউমার মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশ কিংবা মেরুদণ্ডেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
যাদের ঝুঁকি বেশি
বয়স
ব্রেন টিউমার সব বয়সেই হতে পারে। তবে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের টিউমার নির্দিষ্ট বয়সে বেশি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, শিশুদের মধ্যে মেডুলোব্লাস্টোমা তুলনামূলক বেশি শনাক্ত হয়। অন্যদিকে, ৫০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের মধ্যে গ্লিওব্লাস্টোমার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
পারিবারিক ইতিহাস ও জেনেটিক কারণ
পরিবারের কোনো সদস্য আগে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে। পাশাপাশি কয়েকটি বংশগত রোগ ও জিনগত সমস্যার সঙ্গেও ব্রেন টিউমারের সম্পর্ক রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নিউরোফাইব্রোমাটোসিস টাইপ-১ ও টাইপ-২, টিউবারাস স্ক্লেরোসিস, লি-ফ্রাউমেনি সিনড্রোম, ভন হিপেল-লিনডাউ সিনড্রোম, টার্নার সিনড্রোম, টারকট সিনড্রোম এবং গরলিন সিনড্রোম।
উচ্চমাত্রার রেডিয়েশনের সংস্পর্শ
মাথা বা ঘাড়ে পূর্বে রেডিওথেরাপি নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শৈশবে রেডিয়েশন থেরাপি গ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
যাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এইচআইভি বা এইডসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর দীর্ঘদিন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দমনকারী ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রে ব্রেন টিউমারের আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
স্থূলতা
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা কিছু ধরনের ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে মেনিনজিওমা হওয়ার ক্ষেত্রে স্থূলতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
শরীরের অন্য অংশে ক্যানসার
ফুসফুস, স্তন, কিডনি, কোলন বা ত্বকের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ক্যানসার কোষ মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে সেকেন্ডারি বা মেটাস্ট্যাটিক ব্রেন টিউমার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ
দীর্ঘদিন ধরে কিছু রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে কীটনাশক, পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থ এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, দীর্ঘদিন মাথাব্যথা, খিঁচুনি, দৃষ্টিজনিত সমস্যা, ভারসাম্যহীনতা বা আচরণগত পরিবর্তনের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনাও অনেক বেড়ে যায়।
ডিসি/আপ্র/২৩/৬/২০২৬