গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

নতুন ড্রোন বহরে উন্মোচিত হবে গভীর সমুদ্রের রহস্য

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:৩৯ পিএম, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০১:৩২ এএম ২০২৬
নতুন ড্রোন বহরে উন্মোচিত হবে গভীর সমুদ্রের রহস্য
ছবি

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র একশটির বেশি ও চীন ৩০টিরও বেশি গভীর সমুদ্র উপযোগী ড্রোনের বহর পরিচালনা করছে -ছবি আর্গো প্রোগ্রাম

পৃথিবীর ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশজুড়ে রয়েছে মহাসাগর। অথচ এর গভীরতম বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো মানুষের পর্যবেক্ষণের বাইরে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের পানি ক্রমেই উষ্ণ হয়ে ওঠায় এই অজানা অংশ সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। সেই ঘাটতি পূরণে এবার গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম স্বয়ংক্রিয় ভাসমান যন্ত্রের বহর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফ্রান্সের রাষ্ট্রীয় মহাসাগর গবেষণা সংস্থা ইফরেমারের তৈরি নতুন প্রজন্মের গভীর সমুদ্রের ভাসমান যন্ত্র এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে আরো ৩০টি গভীর সমুদ্রের ভাসমান যন্ত্র আন্তর্জাতিক আর্গো বহরে যুক্ত হবে। এর ফলে সমুদ্রের ৯৮ শতাংশেরও বেশি এলাকায় গভীর স্তর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ চালানো সম্ভব হবে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম এনগ্যাজেট।

বর্তমান আর্গো কর্মসূচির অধিকাংশ ভাসমান যন্ত্র সমুদ্রের ওপরের ২ হাজার মিটার পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করে। নতুন প্রজন্মের গভীর আর্গো যন্ত্রগুলো ৪ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬ হাজার মিটার গভীরতায় পৌঁছাতে পারে। ফলে এত দিন পর্যবেক্ষণের বাইরে থাকা সমুদ্রের গভীর স্তর সম্পর্কে তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও চাপসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

ছয় কিলোমিটার গভীরে ফ্রান্সের সাফল্য: ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া আর্গো একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক কর্মসূচি। এর আওতায় বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ হাজার ভাসমান যন্ত্র মোতায়েন রয়েছে। এসব যন্ত্র নির্দিষ্ট গভীরতায় ভেসে থেকে সমুদ্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করে এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পানির ওপরের দিকে উঠে সংগৃহীত তথ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাঠায়।

তবে প্রচলিত আর্গো যন্ত্রের সক্ষমতা মূলত ওপরের ২ হাজার মিটার পর্যন্ত সীমিত। এ কারণে সমুদ্রের গভীরতর স্তরের উষ্ণতা, লবণাক্ততা ও জলস্রোত সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। আর্গো কর্মসূচির গভীর সমুদ্র শাখা সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার মিটার গভীরতায় পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরি করছে।

ইফরেমারের তৈরি ‘ডিপ-৬০০০’ প্রোটোটাইপ চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রায় ছয় কিলোমিটার গভীরতায় পাঁচটি সফল ডুব দেয়। এসব অভিযানে সমুদ্রের অতল তলদেশ বা অ্যাবিসাল অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর ফ্রান্সও ছয় কিলোমিটার গভীরতায় পৌঁছাতে সক্ষম আর্গো ভাসমান যন্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইফরেমারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে আরো ৩০টি গভীর সমুদ্রের ভাসমান যন্ত্র আর্গোর আন্তর্জাতিক বহরে যুক্ত হবে। এতে সমুদ্রের গভীর স্তরের পর্যবেক্ষণ আরো বিস্তৃত হবে।

ছয় হাজার মিটারে প্রযুক্তির বড় পরীক্ষা: সমুদ্রের গভীরে নামার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাপ দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রায় ১০ মিটার গভীরতা বাড়ার সঙ্গে পানির চাপ এক বায়ুমণ্ডল করে বাড়ে। ফলে ৬ হাজার মিটার গভীরে পানির চাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় ৬০০ গুণ হতে পারে। এই বিপুল চাপের মধ্যেও দীর্ঘ সময় নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করার মতো যন্ত্র তৈরি করাই গভীর সমুদ্রের গবেষণায় অন্যতম বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

ইফরেমারের প্রোফাইলার প্রযুক্তি উন্নয়ন বিভাগের প্রধান জেভিয়ের আন্দ্রের ভাষ্য, এমন ব্যবস্থা তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, যা গভীর সমুদ্রের প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে পারবে, দীর্ঘ সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করার মতো শক্তি সংরক্ষণ করবে এবং একই সঙ্গে উৎপাদন ও পরিচালনার খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখবে।

এই চাপ মোকাবিলায় ডিপ-৬০০০-এর খোলস তৈরিতে টাইটানিয়ামের পাশাপাশি বিভিন্ন সংকর ও যৌগিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। যন্ত্রটির ওজন প্রায় ৮৮ পাউন্ড বা ৪০ কেজি। গভীর সমুদ্রের প্রবল চাপ সহ্য করার জন্য এর নকশা প্রচলিত আর্গো ভাসমান যন্ত্রের তুলনায় ভারী করা হয়েছে।

গভীর আর্গো ভাসমান যন্ত্রগুলো সাধারণত প্রায় ১০ দিনের চক্রে কাজ করে। পানিতে নামানোর পর যন্ত্রটি নির্দিষ্ট গভীরতায় ভেসে থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর আরো গভীরে গিয়ে সমুদ্রের তলদেশের কাছাকাছি পর্যবেক্ষণ চালিয়ে আবার ওপরের দিকে উঠে আসে। পানির ওপর পৌঁছানোর পর সংগৃহীত তথ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গবেষণাকেন্দ্রে পাঠানো হয়। গভীর আর্গোর বিভিন্ন মডেল ৪ হাজার বা ৬ হাজার মিটার পর্যন্ত গিয়ে সমুদ্রের তলদেশ থেকে পৃষ্ঠ পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম।

একটি ভাসমান যন্ত্রের ব্যাটারি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ ধরনের চক্র বারবার চলতে পারে। সাধারণ আর্গো যন্ত্রের ক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে প্রায় দেড় শতাধিক চক্র সম্পন্ন করার সক্ষমতা থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তন বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: গভীর সমুদ্রের এসব যন্ত্র শুধু সমুদ্রের গভীরতা মাপবে না, সংগ্রহ করবে জলবায়ু পরিবর্তন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য। তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও চাপের পাশাপাশি বিভিন্ন আর্গো যন্ত্রে অক্সিজেন, অম্লত্বসহ অন্যান্য জৈব-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরিমাপের সেন্সরও যুক্ত করা যায়।

সমুদ্র পৃথিবীর অতিরিক্ত তাপের বড় একটি অংশ শোষণ করে। ফলে সমুদ্রের গভীর স্তরে কতটা তাপ জমা হচ্ছে এবং সেই তাপ কীভাবে স্রোতের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, তা বোঝা জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আর্গোর তথ্য মৌসুমি বায়ু, সমুদ্রের উষ্ণতা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বৃহৎ জলস্রোতের পরিবর্তনসহ বিভিন্ন জলবায়ু-সংক্রান্ত ঘটনা ও পূর্বাভাস উন্নত করতে ব্যবহৃত হয়। আর্গো কর্মসূচির তথ্য গবেষকদের সমুদ্রের তাপ ও মিঠা পানির সঞ্চয়, পরিবহন এবং বৃহৎ আকারের সমুদ্রসঞ্চালন বুঝতেও সহায়তা করে।

বিশ্বজুড়ে আর্গোর সংগৃহীত তথ্য গবেষক ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। গভীর আর্গোর তথ্যও বৈশ্বিক সমুদ্র পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে। তবে ২ হাজার মিটারের নিচে সংগৃহীত তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে এখনো প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন চলছে এবং আর্গো কর্তৃপক্ষ এসব গভীরতার তথ্য ব্যবহারে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানিয়েছে।


ইফরেমারের ভৌত সমুদ্রবিজ্ঞানী ভার্জিনি থিয়েরির মতে, নতুন ডিপ-৬০০০ বহর গভীর সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত উষ্ণতা পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রের স্রোত সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যাবে, যা তাপ ও কার্বন কীভাবে গভীর সমুদ্রে সঞ্চিত হচ্ছে তা বোঝার পাশাপাশি সমুদ্রের বিভিন্ন পূর্বাভাস মডেলকে আরো নিখুঁত করতে সহায়তা করবে।

আর্গো কর্মসূচিতে ৬০টিরও বেশি দেশের অংশগ্রহণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গভীর আর্গোর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে সমুদ্রের যে বিশাল অংশ এখনো তুলনামূলকভাবে অজানা, তার পরিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের হাতে আরো ধারাবাহিক ও গভীর তথ্য আসবে।
সানা/আপ্র/২৪/৯/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

২০২৭ সালে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০২৭ সালে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে বিশ্ব

প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়মিত নতুন রেকর্ড গড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বৈশ্বি...

নিজস্ব প্রযুক্তিতে ৩৫০ কিলোমিটার গতির বুলেট ট্রেন বানাচ্ছে ভারত
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিজস্ব প্রযুক্তিতে ৩৫০ কিলোমিটার গতির বুলেট ট্রেন বানাচ্ছে ভারত

বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতায় উচ্চগতির বুলেট ট্রেন তৈরির পথে এগোচ্ছে ভারত। দে...

ফেসবুক ইনস্টাগ্রামে হঠাৎ বিভ্রাট
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফেসবুক ইনস্টাগ্রামে হঠাৎ বিভ্রাট

যুক্তরাষ্ট্রে সাময়িক বিভ্রাটের পর স্বাভাবিক হয়েছে মেটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম।...

চ্যাটজিপিটিতে মুছে ফেলা তথ্য কি ফেরত আনা যায়
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চ্যাটজিপিটিতে মুছে ফেলা তথ্য কি ফেরত আনা যায়

চ্যাটজিপিটিতে প্রতিদিন নানা ধরনের কথোপকথন করেন ব্যবহারকারীরা। এসব কথোপকথনের কিছু সময়ের পর অপ্রয়োজনীয়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাস ভাড়া বাড়লো কিলোমিটারে ১৭ পয়সা, প্রজ্ঞাপনের আগেই বাড়তি আদায়

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহনকর্মীদের কেউ কেউ। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা, কোথাও প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা করে বেশি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসেও গন্তব্যভেদে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ সরকার ও সড়ক পরিবহন মালিকপক্ষ প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন বাস ভাড়ার এই নৈরাজ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে?

মোট ভোট: ০ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে