ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের চার দিন পর মৃতের সংখ্যা এক হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকাগুলোতে জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দেশটিতে ইতোমধ্যে এক হাজার ৬০০–এর বেশি বিদেশি উদ্ধারকর্মী পৌঁছেছেন, আরও কয়েকটি দল পথে রয়েছে।
গত বুধবার (২৪ জুন) স্থানীয় সময় সন্ধ্যার আগে এক মিনিটেরও কম ব্যবধানে উত্তরাঞ্চলে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে বন্দরনগরী লা গুয়াইরা এবং রাজধানী কারাকাসের কিছু অংশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। মূল ভূমিকম্পের পর থেকে কয়েকশ পরাঘাতও অনুভূত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কয়েকশ মানুষ নিখোঁজ অথবা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন। তবে বিরোধী দল-সমর্থিত একটি ওয়েবসাইটে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ থাকার দাবি করা হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে নিখোঁজ প্রায় ৫০ হাজার। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার পূর্বাভাস, এ ভূমিকম্পে শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরা রাজ্যের উপকূলীয় শহর কারাবালেদায় উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। মার্কিন হেলিকপ্টারে করে উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবীরা অভিযোগ করেছেন, ভারী যন্ত্রপাতির অভাব এবং সরকারি সহায়তার সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা জান কার্লোস রোয়া গার্সিয়া বলেন, তাঁদের আবাসিক ভবন ধসে না পড়লেও এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে যে সেখানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি অভিযোগ করেন, এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি।
সংগীতশিল্পী জাইরা কাস্ত্রোও সরকারের ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মানুষ একে অপরের সহযোগিতায় টিকে আছে, সরকারের ওপর তাদের নির্ভরতা নেই।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ কারাকাসের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন। তারা অভিযোগ করেন, ভয়াবহ এ দুর্যোগেও সরকার কার্যকর সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরায় শতাধিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা রয়েছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দা আইলিন লাদা বলেন, ধ্বংসস্তূপ সরাতে জরুরি ভিত্তিতে ভারী যন্ত্রপাতি প্রয়োজন।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে জীবিতদের উদ্ধারের দৃশ্যও দেখা গেছে।
ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও চরম চাপের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিনের অর্থসংকটে দুর্বল হয়ে পড়া হাসপাতালগুলো বিপুলসংখ্যক আহতকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
আহত মারিয়া ভার্গাস বলেন, এটি ছিল ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, বহু পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছে। নিজের বাড়িঘর হারালেও বেঁচে থাকাকে তিনি সৌভাগ্য বলে মনে করেন।
এদিকে ভূমিকম্পের পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় জীবিতদের উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। তবু উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের খুঁজে পেতে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। সূত্র: রয়টার্স ও বিবিসি।
সানা/আপ্র/২৮/৬/২০২৬