ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের মাঠে বড় পর্দায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে হল ছাত্র সংসদের নেতাদের হাতে হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন সাবেক শিক্ষার্থী। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হল ছাত্র সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক সাজু মিয়া, যিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে স্বীকার করেছেন। তবে তিনি নারী হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের পাশাপাশি তদন্ত ও দোষীদের শাস্তির দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারী মুহতাসিন বিল্লাহ ইমন, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঠারো-উনিশ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, গত শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে ফ্রান্স ও নরওয়ের মধ্যকার বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখতে তারা কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী শহীদুল্লাহ হলে যান। নিয়ম অনুযায়ী হলের রেজিস্টার খাতায় নাম লিখে প্রবেশের পর তারা মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক নারী শিক্ষার্থীও ছিলেন।
ইমনের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে প্রথমে তাদের পরিচয় জানতে চান। পরিচয় দেওয়ার পর তাদের প্রশ্ন করা হয়, ‘কোন যুক্তিতে একজন নারীকে নিয়ে ছেলেদের হলে খেলা দেখতে এসেছেন?’ তারা জানান, অতীতেও একইভাবে বিশ্বকাপের খেলা দেখতে সেখানে এসেছেন এবং তাদের সঙ্গে থাকা নারীও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তার ছোট ভাই শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী বলেও উল্লেখ করা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে আরও আট-নয়জন এসে তাদের ঘিরে ধরেন এবং চাপ সৃষ্টি করেন। এ সময় সমাজসেবা সম্পাদক পরিচয় দেওয়া সাজু মিয়া এবং ক্রীড়া সম্পাদক পরিচয় দেওয়া আরেকজন বলেন, হলের শিক্ষার্থীরা ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে অপমান করতে পারে। পরে সাজু মিয়া উচ্চস্বরে তাদের হল ছেড়ে চলে যেতে বলেন এবং সেখানে নারী নিয়ে অবস্থান করা যাবে না বলে জানান।
ইমন আরও দাবি করেন, তাদের একজন জানালে যে সঙ্গে থাকা নারী তার স্ত্রী, এরপরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পুরো আয়োজন তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় নানা বিষয় সামলাতে হয়। তিনি এ ঘটনাকে হয়রানি আখ্যা দিয়ে বিচার দাবি করেন এবং বিশ্বকাপের মতো উৎসবমুখর পরিবেশে ক্যাম্পাসে মব সংস্কৃতির অবসান ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার নিরাপদে খেলা দেখার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
অভিযোগের বিষয়ে সাজু মিয়া বলেন, তারা সংশ্লিষ্টদের ভদ্রভাবে চলে যেতে বলেছিলেন। তার দাবি, নারীকে নিয়ে কোনো ধরনের আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়নি; বরং সাবেক শিক্ষার্থীরাই উত্তেজিত আচরণ করেন।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মিডিয়া ও প্রচার সম্পাদক মিফতাহুল মারুফও নারী হেনস্তার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটি মূলত সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে কথাকাটাকাটির ঘটনা। তার ভাষ্য, শিবিরবিরোধী জোট ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে।
হল ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক তৌকির হাসান বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ তাদের কাছে জমা পড়েনি। লিখিত অভিযোগ পেলে হল সংসদ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
ঘটনার পর রোববার সকালে আর্জেন্টিনা দলের ম্যাচ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুফিয়া কামাল হলের একদল শিক্ষার্থী শহীদুল্লাহ হলের মাঠে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ জানান। পরে তারা প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে নারী হেনস্তা প্রতিরোধ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিচারের দাবি জানান। একই দাবিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শহীদুল্লাহ হল শাখাও পৃথক স্মারকলিপি জমা দেয়। স্মারকলিপিতে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের হল প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাকে নিন্দনীয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের পরিপন্থি বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের শহীদুল্লাহ হল শাখা -ছবি সংগৃহীত
এ ঘটনায় বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও তীব্র নিন্দা জানিয়ে এক যৌথ বিবৃতিতে সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পাসে মব সংস্কৃতি, নৈতিক পুলিশিং, নারী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটি নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীর নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং হয়রানিমূলক আচরণ রোধে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানায়।
শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর একজন সহকারী প্রক্টরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সানা/আপ্র/২৮/৬/২০২৬