প্রতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসের শেষ শনিবার জাতীয় অবিবাহিত দিবস হিসেবে উদযাপিত করা হয়ে থাকে। ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ‘বাকআই সিঙ্গেলস কাউন্সিল’ অবিবাহিত জীবনকে উদযাপন এবং এর স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে চালু করা হয় প্রথম জাতীয় অবিবাহিত দিবস। পরবর্তীকালে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহের শেষ শনিবার জাতীয় অবিবাহিত দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাতীয় অবিবাহিত দিবস পালন করা হয় নিজের স্বাধীনতা, আত্মপ্রেম ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানোর জন্য। দিনটিতে অনেকে একা থেকে, অনেকে নিজের মতো সময় কাটিয়ে থাকেন। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে থাকেন কিংবা পছন্দের খাবার খেয়ে বা কোথাও ঘুরে এই দিনটি উদযাপন করেন।
এক সময় অবিবাহিত থাকাকে সমাজের চোখে সমস্যা তো বটেই, কখনও কখনও অভিশাপও মনে করা হতো; বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ ছিল আরও বেশি। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন অনেক নারী-পুরুষই নিজের ইচ্ছায় অবিবাহিত জীবন বেছে নিচ্ছেন এবং এই জীবনের স্বাধীনতা, স্বাচ্ছন্দ্য ও নানা সুবিধা উপভোগ করছেন।
অবিবাহিত মানেই ‘কেউ পেল না’ এই পুরোনো ধারণাও এখন অনেকটাই সেকেলে। কেউ হয়তো সঙ্গী খুঁজছেন না, কেউ নিজের ক্যারিয়ার ও স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত আবার কেউ নিজের একার সঙ্গেই বেশ সুখে আছেন। কারণ সুখী থাকার জন্য যে বিয়ের সনদ বাধ্যতামূলক- এমন কোনও নিয়ম এখনও চালু হয়নি!
অবিবাহিত দিবসের শুরু যেভাবে: প্রায় চার দশক আগে একদল মানুষ নিজেদের অবিবাহিত জীবনকে উদ্যাপন করার উদ্যোগ নেন। ভালোবাসা ও বিবাহ ঘিরে যখন একের পর এক দিবস পালিত হচ্ছে, তখন অবিবাহিতদের জন্যও একটি দিন থাকা দরকার এমন ভাবনা থেকেই ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের বাকআই সিঙ্গেলস কাউন্সিল জাতীয় অবিবাহিত সপ্তাহ চালু করে।
ইতিহাসের পাতায় অবিবাহিত জীবন: অবিবাহিত থাকা নিয়ে সামাজিক ধারণা বদলানোর গল্প অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ১৫৫৮ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসা প্রথম এলিজাবেথ বিয়ের জন্য নিয়মিত সামাজিক চাপের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় ৪৫ বছরের শাসনামলে নিজের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা ধরে রাখেন তিনি। ১৯১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাও ছিল নারীর স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। আর ১৯৮০-এর দশকে শুরু হয় জাতীয় অবিবাহিত সপ্তাহ। পরে ১৯৯০-এর দশকে চীনের নানজিংয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১১ নভেম্বরকে অবিবাহিতদের উদ্যাপনের দিন হিসেবে পালনের চল শুরু হয়।
একা থাকার সুবিধাও কম নয়: অবিবাহিত জীবন নিয়ে গবেষণায় বেশ কিছু ইতিবাচক দিকের কথাও উঠে এসেছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পর্কে থাকা মানুষের তুলনায় অবিবাহিত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে বেশি শরীরচর্চা করেন এবং শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন। অবিবাহিতদের পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথাও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বয়স্ক বাবা-মা কিংবা প্রয়োজনের সময় পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তাদের বেশি থাকতে পারে। বন্ধুত্বও অনেকের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর ঘুম? সঙ্গীর নাক ডাকার সঙ্গে রাতের শান্তির যুদ্ধ করতে না হলে একা ঘুমানোর সুবিধাটা নিশ্চয়ই অস্বীকার করা কঠিন! কিছু গবেষণাতেও একা ঘুমালে তুলনামূলকভাবে ভালো ঘুমের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
এদিনে চলে বন্ধুদের নিয়ে খাওয়া-দাওয়া: অবিবাহিত দিবসে প্রেমের জোড়ার বদলে বন্ধুদের জোড়া জমে। কাছের বন্ধুদের নিয়ে রাতের খাবার, আড্ডা কিংবা এক কাপ কফির আয়োজনে হয় চমৎকার উদযাপন। সবচেয়ে বড় সুবিধা কোথায় যাবেন, কখন ফিরবেন কিংবা কার সঙ্গে দেখা করবেন, এর জন্য ‘অনুমোদন বোর্ডে’ আবেদন করার দরকার নেই!
অবিবাহিত মানুষের সংখ্যাও কম নয়: ২০২৩ সালের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ১২ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ নারী ও ৪৭ শতাংশ পুরুষ। এই অবিবাহিত মানুষের ৫৬ শতাংশেরও বেশি জানিয়েছেন, তারা অগত্যা প্রেমের সম্পর্ক বা জীবনসঙ্গী খুঁজছেন না। অর্থাৎ সবাই যে ‘কাউকে খুঁজছি’ অবস্থায় আছেন, বিষয়টি মোটেও এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে অবিবাহিত নারীদের নিজের বাড়ির মালিক হওয়ার হারও অবিবাহিত পুরুষদের তুলনায় বেশি। কিছু বিশেষজ্ঞের পূর্বাভাস অনুযায়ী সহস্রাব্দ প্রজন্মের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ কখনো বিয়ে নাও করতে পারেন।
একাই ঘুরতে বেরিয়ে পড়া: অনেক দিনের ভ্রমণের ইচ্ছা থাকলে আজই পরিকল্পনা শুরু করা হয়। কাছের কোনো জাদুঘর ঘুরে দেখা থেকে শুরু করে একা পাহাড়ে হাঁটা পছন্দের কিছুই বাদ দেওয়ার থাকে। সামর্থ্য অনুযায়ী ইউরোপ ভ্রমণ কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় ক্যাঙ্গারু দেখার স্বপ্নও তালিকায় থাকে।
একা নন- সমাজের সঙ্গেও আছেন: অবিবাহিত থাকা মানেই একা থাকা নয়। জাতীয় অবিবাহিত দিবসে নিজের সময় অন্যের জন্যও কাজে লাগানো যায়। স্থানীয় কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী হওয়া, প্রবীণ নিবাসে গিয়ে বই পড়ে শোনানো কিংবা গাছ লাগানোর মতো সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া যেতে পারে। কারণ জীবনসঙ্গী না থাকলেও সঙ্গ দেওয়ার মতো মানুষ, ভালোবাসার মতো মানুষ এবং সমাজের জন্য করার মতো অনেক কিছুই থাকে।
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬