জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, দেশে বিদ্যমান গ্যাস মজুত দিয়ে আনুমানিক ১২ বছর সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
রোববার (১৯ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৬তম দিনের কার্যক্রমে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, দেশে মোট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত ২৯ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে ২২ দশমিক ১১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে এবং দৈনিক গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এই মজুত দিয়ে প্রায় ১২ বছর চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।
গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান, পেট্রোবাংলার পরিকল্পনার আওতায় ৫০ ও ১০০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির মধ্যে এ পর্যন্ত ২৬টি কূপের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে চলমান রয়েছে।
সাইসমিক জরিপ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বাপেক্স ব্লক-৭ ও ৯ এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক সাইসমিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াকরণ করছে। বিজিএফসিএল হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা এলাকায় ১ হাজার ৪৫০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ত্রিমাত্রিক সাইসমিক জরিপ শুরু করবে। এছাড়া ভোলার চরফ্যাশন, জামালপুর, তিতাস, নরসিংদীসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও বিস্তৃত ত্রিমাত্রিক জরিপের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্ববাজারের চাপেও সীমিত মূল্যবৃদ্ধি: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হলেও সরকার জনগণের কথা বিবেচনা করে সীমিত পরিসরে মূল্য সমন্বয় করেছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি মন্ত্রী।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় জ্বালানি আমদানিতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। তবুও ভর্তুকি দিয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, প্রতি লিটার অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা, ডিজেল ১১৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে অকটেন ছিল ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা, ডিজেল ১০০ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা।
বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া বিল ৫২ হাজার কোটি টাকা: বিদ্যুৎ খাতে সরকারি, বেসরকারি ও আমদানিকৃত বিদ্যুৎসহ মোট বকেয়া বিলের পরিমাণ ৫২ হাজার ৩০০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী।
সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এর মধ্যে গ্যাস বিল বাবদ পেট্রোবাংলার কাছে বকেয়া রয়েছে ১১ হাজার ৬৩৪ কোটি ৬ লাখ টাকা এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিপরীতে বকেয়া ৩ হাজার ৮৯১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
তিনি আরও জানান, গ্যাস ও তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি ও জ্বালানি বাবদ বকেয়া ১৭ হাজার ৩৫৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের বকেয়া ১৫ হাজার ৪৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এছাড়া সরকারি কোম্পানির বকেয়া ৫ হাজার ৬২৩ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং হুইলিং চার্জ বাবদ বকেয়া রয়েছে ১৯৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
মন্ত্রী জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
জ্বালানিতে কৃত্রিম সংকট: দেশে জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই, তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে কিছু ফিলিং স্টেশনে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানি মন্ত্রী।
জাতীয় সংসদে নেত্রকোণা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত বছরের মার্চ মাসের মতো চলতি বছরেও সমপরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। তবে আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করেন, পাম্পে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেওয়া বা মোটরসাইকেলে চিহ্ন দেওয়ার বিষয়ে কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই।
কৃত্রিম সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি জানান, সারাদেশে প্রশাসন ও বিপিসির তত্ত্বাবধানে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা হয়েছে, জরিমানা আদায় হয়েছে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার বেশি এবং জব্দ করা হয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল। জ্বালানি বিপণনে স্বচ্ছতা আনতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সারাদেশে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সানা/আপ্র/১৯/৪/২০২৬