প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া ও চীন সফর ঘিরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও উন্নয়ন কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সফরে তিস্তা প্রকল্প, দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং চীনের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণসহ একাধিক কৌশলগত ইস্যু আলোচনায় আসবে।
শনিবার (২০ জুন) সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম সফরের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী ২১ থেকে ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন এবং ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফরে থাকবেন। সফরসূচিতে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, চীনের দালিয়ান ও বেইজিংসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিবের তথ্য অনুযায়ী, চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং ২৬ জুন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এসব বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর ও কৌশলগত পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে।
সফরে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে জানান সচিব। তিনি বলেন, যমুনা–ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় উজানের প্রকল্পগুলোর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরবে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে। প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কিছু কারিগরি বিষয় এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ-গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ, গ্লোবাল সিভিলাইজেশন ইনিশিয়েটিভ এবং গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ-এ বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি সফরের অন্যতম আলোচ্য বিষয় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এসব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানায় এবং অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো পর্যালোচনাধীন রয়েছে। সফরের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
সামরিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। লিডারশিপ পর্যায়ে নীতিগত আলোচনা হলেও অস্ত্র ক্রয় বা প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো মূলত কার্যকরী ও কারিগরি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীন সফরে মোট ১৫ থেকে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা এবং একটি প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এসব দলিল বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও জনসম্পর্কসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়া সফরেও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে বলে জানান সচিব। সেখানে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, আসিয়ানে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সমর্থন আদায়ের বিষয়টি এজেন্ডায় রয়েছে।
তিনি আরো জানান, মালয়েশিয়া সফরে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল সইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
চীন সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এরপর বেইজিংয়ে তিনি চীনা ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরবেন এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানাবেন।
সফরের প্রথম দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক এবং কৌশলগত আলোচনা চলবে। পরবর্তী ধাপে বেইজিংয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে সরকার আশাবাদী। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া সফরও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে আরো বিস্তৃত করবে।
সানা/আপ্র/২০/৬/২০২৬