দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী আতিয়া ইসলাম আর নেই। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বেলা তিনটায় রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্যানসারে ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর।
বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলায় নারীর অধিকার, বৈষম্য, সহিংসতা ও সামাজিক অসংগতির প্রতিবাদী শিল্পভাষার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন আতিয়া ইসলাম। ক্যানভাসে রং ও রেখার মাধ্যমে তিনি পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর অবস্থান, পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য, বৈষম্য ও নির্যাতনের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তাঁর শিল্পকর্মে স্থান পেয়েছে নারীবাদী আন্দোলন, প্রতিবাদ এবং সামাজিক প্রতিরোধের নানা অনুষঙ্গ। এ কারণেই তিনি নারীবাদী শিল্পী হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন।
বাস্তবধর্মী ধারার চিত্রকলায় বক্তব্যপ্রধান কাজের জন্য সুপরিচিত ছিলেন আতিয়া ইসলাম। নারীর প্রতি অন্যায়ের প্রতিবাদের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক-সামাজিক সংকট তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল। রং ও রেখার মাধ্যমে তিনি সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে ছিলেন সবসময় সোচ্চার।
তাঁর চিত্রকলায় উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। রূপক, ব্যঙ্গ ও প্রতীকনির্ভর শিল্পভাষার মাধ্যমে তিনি শক্তিশালী বক্তব্য তুলে ধরতেন। নব্বইয়ের দশকে দেশের নারী শিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র শিল্পভাষা, বক্তব্যের স্পষ্টতা এবং উপস্থাপনার বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি বিদগ্ধজনের প্রশংসা অর্জন করেন এবং নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন।
১৯৬২ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন আতিয়া ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগ থেকে ১৯৮২ সালে বিএফএ এবং ১৯৮৫ সালে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮১-৮২ শিক্ষাবর্ষে তিনি চারুকলার ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় সানবিমসে চিত্রাঙ্কনের শিক্ষক ছিলেন। রাজধানীর ধানমন্ডিতে তিনি ‘ঝাপি স্কুল অব আর্ট’ নামে শিশুদের জন্য একটি চিত্রাঙ্কন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় তিনি বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম আলোর ঈদসংখ্যায় অলংকরণ করেছেন এবং পত্রিকাটির আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও বিচারক ছিলেন।
গ্যালারি ২১, বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টস ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া ১৯৮১ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, মিয়ানমার ও বাংলাদেশে ৬০টির বেশি দলীয় প্রদর্শনীতে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন দলীয় প্রদর্শনীতে তাঁর শিল্পকর্ম স্থান পায়।
তাঁর প্রথম একক শিল্পপ্রদর্শনীর বিষয় ছিল নারী ও সমাজ। দ্বিতীয় একক প্রদর্শনীতে উঠে আসে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট। আর তৃতীয় একক প্রদর্শনীতে জীবনযাপন, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে উপজীব্য করে আঁকা চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়।
১৯৭৬ সালে জুনিয়র রেডক্রস জাতীয় চিত্র প্রদর্শনীতে প্রথমবারের মতো পুরস্কার লাভ করেন আতিয়া ইসলাম। পরে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত ১৮তম এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল বাংলাদেশে তিনি প্রধান পুরস্কার অর্জন করেন।
আতিয়া ইসলামের বাবা আজিজুল ইসলাম ভুইয়া এবং মা আয়শা ইসলাম—দুজনই প্রয়াত। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তাঁর স্বামী শিল্পী হাসান মাহমুদ। তাঁদের দুই মেয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্রান্সপ্রবাসী চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের শ্যালিকা ছিলেন আতিয়া ইসলাম।
শিল্পী হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবারই রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে আতিয়া ইসলামকে দাফন করা হবে।
সানা/আপ্র/৩/৭/২০২৬