স্বামীর স্বল্প আয়ে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বীণা রানী দাসের সংসারে টানাটানি লেগে থাকত। মাঝবয়সী বীণা তখনও বেশ শক্তপোক্ত। দালালের প্রলোভনে গ্রামের জমি বিক্রির টাকা দিয়ে তিনি সৌদি আরব যান। দালাল তাকে বলেছিল, এক শেখের বাসায় তার দুই সন্তানের দেখাশোনা আর অল্প কিছু গৃহস্থালি কাজ। যেমন- ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়া, প্যাকেট খুলে ওভেনে ঢুকিয়ে দিলেই রান্না হবে। কিন্তু বাস্তবচিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফজরের নামাজের পর শুরু হতো যে ডিউটি সেটি চলত মধ্যরাত পর্যন্ত। চারজন মানুষের জন্য রান্না, ঘর পরিষ্কার করা, কাপড় কাচাসহ আরও অনেক কাজ করতে হতো। আর সেসব কাজে নানা রকম ভুল-ত্রুটি ধরে তার ওপর চালাত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দেশে ফোন করে কথা বলার অনুমতি ছিল না। এর চেয়েও বড় মানসিক শাস্তি ছিল, বীণাকে জোর করে নামাজ পড়তে বাধ্য করা হতো। সনাতন ধর্মের বীণা নামাজ পড়তে পারে না বলেও তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে। দালাল তাকে যে বেতনের কথা বলেছিল, বাস্তবে সে তার চেয়ে কম পরিমাণ বেতন পেয়েছে। বীণা চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরতে চাইলে তাকে বলা হয়েছে, দুই বছরের চুক্তি মোতাবেক তাকে নেওয়া হয়েছে। তাই দুই বছরের আগে সে কোনোমতেই ফিরতে পারবে না। অবশেষে দুই বছর পর বীণা ভাঙামন ও ভাঙা স্বাস্থ্য নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। এ গল্প শুধু বীণার একার নয়। অভিবাসী নারীশ্রমিকদের সঙ্গে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছরই ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় হাজার হাজার শ্রমিক বিদেশে যায়। তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। এসব শ্রমিকের বড় অংশ যায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ- সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, লেবানন, কুয়েত। এসব দেশে এই নারীশ্রমিকরা মূলত গৃহকর্মী হিসেবেই যায়। এসব নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বঞ্চনা ও প্রতারণার শিকার হন। বেশি অভিযোগ শোনা যায় দীর্ঘ কর্মঘণ্টার। তাদের দেওয়া হয় না কোনো সাপ্তাহিক ছুটি, আছে নিরাপত্তাহীনতা এবং কেউ কেউ ধর্ষণের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন। আবার কাউকে দিয়ে জোর করে পতিতাবৃত্তিও করানো হয়।
অভিবাসীকর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের এক গবেষণায় জানা যায়, বিদেশ থেকে ফিরে আসা ৯৪ শতাংশ নারী শ্রমিক নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির কথা বলেন এবং ৯৭ শতাংশ নারী চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন, ৮০ শতাংশ নারী পর্যাপ্ত খাবার পান না এবং ৮২ শতাংশ নারী দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে বাধ্য হন। ১৫ শতাংশ নারীকে খাবার ও পানি ছাড়া আটকে রাখা হয় এবং ৯৭ শতাংশ শ্রমিক সাপ্তাহিক ছুটি পাননি।
আরেক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিদেশ ফেরত ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হন, ৪৪ শতাংশ নারী তাদের তাদের পাওনা বেতন পান না। এ ছাড়া শারীরিক নির্যাতনের শিকার ও লাশ হয়ে ফেরেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিএমইটি) এবং ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৪৯৩ জন নারীকর্মী বিদেশে গেছেন। ওই একই সময়ে দেশে এসেছে ৪১২ নারীশ্রমিকের মরদেহ। তাদের মধ্যে ৮৪ জন অভিবাসী নারীশ্রমিক আত্মহত্যার শিকার হয়েছেন এবং এসব আত্মহত্যার ঘটনাগুলোর বেশির ভাগ ঘটেছে সৌদি আরবে ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। তবে ঘটনাগুলো প্রকৃতই আত্মহত্যা কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়। কারণ পরিবার থেকে জানানো হয়, লাশের গায়ে নির্যাতনের চিহ্ন আছে। কিন্তু লাশ দেশে আসার পর পুনর্ময়নাতদন্ত না করায় হত্যা, না আত্মহত্যা- এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
অভিবাসন গবেষক ড. তাসনিম সিদ্দিকী তার সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রবন্ধে বলেন, গত প্রায় ৯০ বছরে অভিবাসী বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু অভিবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকারের জায়গা এখন পর্যন্ত জোরালো হয়নি।
মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী দিলরুবা সরমিন বলেন, শ্রমিকরা দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠায়। এতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; বিশেষ করে নারীশ্রমিকদের অভিবাসন নিরাপদ ও আধুনিকীকরণ করতে হবে। দক্ষতা ও সচেতনতার অভাবে কর্মীরা বঞ্চনা ও প্রতারণার শিকার হয়। নারীকর্মীদের বিদেশে যাওয়ার আগে অবশ্যই নিয়োগ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। সে কোথায় যাচ্ছে, কী ধরনের কাজ তাকে করতে হবে, কত ঘণ্টা কাজ করবে, সাপ্তাহিক ছুটি আছে কি না, কত বেতন পাবে এসব বিষয়ে জানতে হবে। এ ছাড়া তার বাসস্থান, চিকিৎসাসেবা, চাকরির মেয়াদকাল, যোগাযোগ নম্বর ইত্যাদি বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জেনে লিখিতভাবে চুক্তিপত্র তৈরি করে তার একটি কপি কর্মীর পরিবারের কাছে রেখে যেতে হবে। তাহলে কর্মী কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হলে বা অন্য যে কোনো প্রয়োজনে নিয়োগ মধ্যস্থতাকারীকে জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে। আর এই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।
কেএমএএ/আপ্র/২৫.০৯.২০২৬