দুই বছর আগে রাতের খাবার খেয়ে অটোরিকশা রাখার ওয়ার্কশপে ঘুমাতে গিয়েছিলেন ১৯ বছরের মো. রাহুল। পরদিন আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। বন্ধ পাওয়া যায় তাঁর মুঠোফোন, খোঁজ মেলেনি অটোরিকশাটিরও। দুই দিন পর ওয়ার্কশপের পাশে ভুট্টাখেতের আইলের ঝোপ থেকে উদ্ধার হয় তাঁর অর্ধগলিত লাশ। দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় পর সেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও গ্রেফতার ব্যক্তিদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় জানা গেছে, নিহত রাহুল ও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পূর্বপরিচিত ছিলেন। ইয়াবা কেনাবেচা ও সেবনের সূত্র ধরেই তাঁদের পরিচয়। পরে ইয়াবা বিক্রির তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার আশঙ্কায় রাহুলকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁকে ডেকে নিয়ে প্রথমে ইয়াবা সেবন করানো হয়। এরপর লোহার অ্যাঙ্গেল, ব্লেড ও অটোরিকশার ব্যাটারি দিয়ে আঘাত এবং পরে শ্বাসরোধ করে তাঁকে হত্যা করা হয়।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, হত্যার পর রাহুলের লাশ একটি গরুর খামারে দুই দিন রাখা হয়। পরে তাঁর অটোরিকশাটি বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং লাশ ফেলে রাখা হয় ওয়ার্কশপের পাশে।
যেভাবে হত্যার শিকার রাহুল
রাহুলের বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার চক সিংহড়া এলাকায়। তিনি অটোরিকশা চালাতেন। ভাড়া করা অটোরিকশাটি তিনি একই এলাকার বাসিন্দা ওমর ফারুকের ওয়ার্কশপে রাখতেন এবং রাতে সেখানেই ঘুমাতেন।
২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে বাসা থেকে রাতের খাবার খেয়ে ওয়ার্কশপে ঘুমাতে যান রাহুল। পরদিন বাড়ি না ফেরায় তাঁর বাবা ওয়ার্কশপে গিয়ে খোঁজ করেন। কিন্তু সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে ওয়ার্কশপের দক্ষিণ-পূর্ব পাশে ভুট্টা ও ঘাসের জমির আইলের ঝোপ থেকে রাহুলের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় ওই দিন রাহুলের বাবা মো. আবদুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে নবাবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে থানা-পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মামলাটির তদন্ত করেন পিবিআইয়ের উপপরিদর্শক মো. আব্দুর রহিম।
যে পরিকল্পনায় হত্যা
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ জানান, গ্রেফতার ব্যক্তিরা রাহুলের পূর্বপরিচিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে লালন মোল্লা ইয়াবার কারবার করতেন। রাহুলসহ অন্যরা তাঁর কাছ থেকে ইয়াবা কিনতেন এবং একসঙ্গে সেবন করতেন।
তদন্তে জানা যায়, লালন মোল্লা সবুজের কাছে জানতে পারেন, তাঁর ইয়াবা বিক্রির তথ্য রাহুল বিভিন্ন জায়গায় জানিয়ে দেবেন বলে সবুজকে জানিয়েছেন। এরপর রাহুলকে হত্যা করে তাঁর অটোরিকশা নিয়ে বিক্রি করার পরিকল্পনা করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে লালন, সবুজকে দিয়ে রাহুলকে অটোরিকশাসহ নবাবগঞ্জের তমসেল মাদবরের খোলা মাঠে ডেকে নেন। সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন লালন, সজল, সমেজ ও গোবিন্দ।
রাহুল সেখানে যাওয়ার পর তাঁকে প্রথমে ইয়াবা সেবন করানো হয়। একপর্যায়ে লালন লোহার অ্যাঙ্গেল দিয়ে তাঁর মাথার পেছনে আঘাত করেন। এতে মাথা ফেটে রক্ত বের হয়। পরে তাঁর কান ও মুখে ব্লেড দিয়ে আঘাত করা হয়। অটোরিকশার ব্যাটারি দিয়েও মুখে আঘাত করা হয়। এরপর শ্বাসরোধ করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
রাহুলের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর লাশ অটোরিকশায় বসিয়ে সজলের গরুর খামারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুই দিন লাশটি রাখা হয়। পরে ৯ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার পর রাহুলের মরদেহ ওমর ফারুকের ওয়ার্কশপের পাশে ফেলে রাখা হয়। সেখান থেকেই পরদিন সকালে অর্ধগলিত অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
দুই ধাপে গ্রেফতার পাঁচজন
তদন্ত কর্মকর্তা গত মার্চে প্রথমে মো. সমেজকে গ্রেফতার করেন। তাঁর বাড়ি নবাবগঞ্জের পাতিলঝাপ এলাকায়। সমেজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই এলাকা থেকে মো. সবুজ মিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। সবুজ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।
সবুজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে গ্রেফতার করা হয় খবির ওরফে গোবিন্দ, মো. হাবিব ওরফে সজল এবং মো. লালন মোল্লাকে। তাঁদের মধ্যে লালন মোল্লাও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বুধবার উত্তরায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রাহুল হত্যার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সানা/আপ্র/৯/১০/২০২৬