কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসছে। ঘটনাস্থলে পাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশার সূত্র ধরে চট্টগ্রাম থেকে চালক সুমনকে আটক করার পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিহত ছাত্রীর মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে সুমন একাই জড়িত, নাকি এর সঙ্গে অন্য কেউ যুক্ত - তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে মোবাইল ফোন উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আটক সুমনের দেখানো স্থান থেকে নিহত ছাত্রীর মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদও চলছে। তদন্তের বিস্তারিত শনিবার সংবাদ সম্মেলনে জানাবেন পুলিশ সুপার।
ওই কর্মকর্তা জানান, পুলিশের পাশাপাশি জেলা গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল ঘটনাটি নিয়ে কাজ করছে। চট্টগ্রাম থেকে সুমনকে আটকের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে কুমিল্লায় আনা হয়। ছাত্রীর অন্যান্য জিনিসপত্র ও ব্যাগ উদ্ধারে অভিযান চলছে। ঘটনার দিন সুমন যাঁদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছিলেন, তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ কাজ করছে। হত্যায় জড়িত সন্দেহে একজনকে আটক করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
হোটেল থেকে বেরিয়ে কোথায় গিয়েছিল ছাত্রী
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে ওই ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের পাশেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পরে মরদেহের কাছাকাছি ছাত্রীর একটি ভ্যানিটি ব্যাগও পাওয়া যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে কুমিল্লা নগরের ভাড়া বাসা থেকে বের হয়েছিল ওই ছাত্রী। পরে সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারে যায়। এরপর ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসে করে বুধবার রাত ১২টার দিকে কুমিল্লা নগরের হোটেল নুরজাহানে পৌঁছায়। রাত সোয়া ১২টার দিকে হোটেল থেকে বেরিয়ে যায় সে।
পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, এরপর ছাত্রীর বাসায় ফেরার কথা ছিল। কিন্তু পরদিন সকালে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গলসংলগ্ন একটি ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পদুয়ার বাজারে নামার পর শহরের দিকে না গিয়ে কীভাবে ওই ছাত্রী লালমাইয়ের নির্জন ধানক্ষেতে পৌঁছাল এবং কারা তাকে হত্যা করেছে - তদন্তে এখন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
অটোরিকশার সূত্র ধরে চালককে আটক
ঘটনাস্থলে পাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখছে পুলিশ। গাড়িটির ভেতরে ছাত্রীর একটি পোশাক পাওয়া যায়। কাছাকাছি পড়ে ছিল তার ভ্যানিটি ব্যাগ। এসব আলামত ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাটি ভাড়ায় নিয়ে চালাতেন সুমন। তাঁর বাড়ি লালমাই-সংলগ্ন জয়পুর এলাকায়। তিনি বেশির ভাগ সময় রাতে পদুয়ার বাজার ও আশপাশের এলাকায় যাত্রী পরিবহন করতেন। নিজের বাড়ি না থাকায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে সুমন আত্মগোপনে ছিলেন। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র ও মুঠোফোন না থাকায় অবস্থান শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়তে হয় তদন্তকারীদের। পরে শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে আটক করা হয়। এর আগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর দুই নিকটাত্মীয়কেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে সুমনের ভূমিকা এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
যশোরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন
ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার রাতে নিহত ছাত্রীর মরদেহ যশোর সদর উপজেলার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে পরিবারে শোকের মাতম শুরু হয়। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তার বাবা-মা। শুক্রবার সকাল ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে লালমাই থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, আটক সিএনজিচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
মোবাইল ফোন উদ্ধারের মধ্য দিয়ে তদন্তে নতুন সূত্র পাওয়া গেলেও হত্যার কারণ, ঘটনার সঙ্গে আর কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না এবং ছাত্রীটি কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল - এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। তদন্তের অগ্রগতি ও পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করছে ঘটনার পুরো রহস্য উন্মোচন।
সানা/আপ্র/১০/১০/২০২৬