গাজীপুরের শ্রীপুরে এক মাদ্রাসা ও দুইটি বিদ্যালয়ের সাত শিক্ষকের বিরুদ্ধে জাল সনদে চাকরি করার অভিযোগ ওঠার প্রায় ২৩ মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অভিযুক্তরা এখনো বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বলা হয়, উপজেলার পটকা দাখিল মাদ্রাসার পাঁচজন, শ্রীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন এবং শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক জাল বা অকার্যকর সনদ ব্যবহার করে চাকরি করছেন।
তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগের তদন্তভার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের ওপর অর্পণ করেন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি দীর্ঘ সময় তদন্ত শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করেছেন। এতে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
পরে শ্রীপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম রানা চলতি বছরের মার্চ মাসে গাজীপুর জেলা প্রশাসক ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পৃথক অভিযোগ করেন। এরপরও চার মাস পার হলেও তদন্ত শেষ হয়নি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে বগুড়ার নট্রামস কর্তৃপক্ষ ২৩ মে ১৯৯৬ তারিখের এক বিজ্ঞপ্তিতে ২৩ এপ্রিল ১৯৯৬-এর পর প্রতিষ্ঠানটির ইস্যুকৃত সব সনদ বাতিল ও সনদ ইস্যু স্থগিত ঘোষণা করে।
তবুও নট্রামসের কথিত অকার্যকর শাখা থেকে ২০০১ সালে ইস্যুকৃত সনদ ব্যবহার করে পটকা দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক মো. সোহরাব ও মকবুল হোসেন এবং শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আলতাফ হোসেন চাকরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া পটকা দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক নাঈম মেহেদীর বিরুদ্ধে কথিত ‘অ্যাপটেক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সনদ ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। শ্রীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আইসিটি শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ‘সেলফ রিলায়েন্ট এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ নামের অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সনদ ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পটকা দাখিল মাদ্রাসার ড্রেস মেকিং ট্রেডের শিক্ষিকা শিরিনা ও খাদিজা আক্তার ময়মনসিংহ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ছয় মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণের পরিবর্তিত বা ঘষামাজা করা সনদ ব্যবহার করে চাকরি করছেন।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ মার্চ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজমিনে তদন্ত করেন এবং অভিযুক্তদের সনদে অসংগতি দেখতে পান। তদন্ত চলাকালে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহে সহযোগিতা না পাওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব হচ্ছে।
এ ঘটনায় পটকা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. রফিকুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে জেলা শিক্ষা অফিস।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষকরা এলাকায় প্রচার করছেন যে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ হয়ে গেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা হবে না। তারা দাবি করেন, প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সহযোগিতায় অভিযোগটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পটকা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষকরা সময়মতো কাগজ দেননি, তাই বিলম্ব হয়েছে। কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার জেলা শিক্ষা অফিসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি ইতোমধ্যে অন্যত্র বদলি হয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন।
তবে গাজীপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আল মামুন তালুকদার জানান, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন তিনি পাননি।
তিনি বলেন, ‘গত ৩০ মার্চ সরেজমিনে তদন্ত করে পটকা দাখিল মাদ্রাসার সুপারকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে বলা হয়েছিল। বারবার চাওয়ার পরও তিনি কাগজ দেননি। তদন্তে সহযোগিতা না করায় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
সানা/আপ্র/২/৮/২০২৬