রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে ডেঙ্গু, হাম ও সিজনাল ফ্লুর পাশাপাশি ঘরে ঘরে দীর্ঘস্থায়ী সর্দি, কাশি ও জ্বর এক নীরব সংকটে রূপ নিয়েছে। যে দৃশ্যটি এখন সবচেয়ে কমন, তা হলো সহজে সারছে না এই সর্দি-কাশি ও জেদি জ্বর। পরিবারের একজন সেরে উঠছেন তো অন্যজন আক্রান্ত হচ্ছেন। আর কাশি বা ক্লান্তি থাকছে সপ্তাহ থেকে মাসজুড়ে। এটি কেবল সাধারণ ঋতু পরিবর্তনের রুটিন সর্দি-কাশি নয়। ক্লিনিক, হাসপাতাল কিংবা বহির্বিভাগ থেকে ব্যক্তিগত চেম্বার- সবখানেই রোগীর উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে নগরবাসীর শরীরের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সুরক্ষাবলয় ভেঙে পড়েছে। এর পেছনে কাজ করছে নগরজীবনের বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনিয়ন্ত্রিত বায়ুদূষণ, মাত্রা অতিরিক্ত ধুলাবালি, অপর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, জনঘনত্ব এবং খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার চাপ মিলিয়ে ফুসফুস এবং মিউকোসাল ইমিউনিটিকে মারাত্মকভাবে সংবেদনশীল করে তুলেছে। ফলে সাধারণ রাইনোভাইরাস, অ্যাডেনোভাইরাস কিংবা সিজনাল প্যাথোজেনগুলো শরীরে প্রবেশ করে স্থায়ী ঘাঁটি গাড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই সাধারণ সর্দি দ্রুত ব্রঙ্কাইটিস, সাইনাস বা সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণে রূপ নিচ্ছে- যা সাধারণ ওষুধে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, সর্দি-কাশি ও জেদি জ্বরের ব্যাপক বিস্তারের নেপথ্যে রয়েছে নগর পরিবেশ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার কাঠামোগত সংকট। ঢাকার বাতাসের মান (অছও) বছরের অধিকাংশ সময় অস্বাস্থ্যকর থাকায় ফুসফুসের এপিথেলিয়াল টিস্যু ও স্থানীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সামান্য জীবাণুও বড় আকার ধারণ করছে। অন্যদিকে ইনডোর পলিউশন বা গৃহমধ্যস্থ দূষণ তথা অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস, এসির ফিল্টারে জমে থাকা ব্যাকটেরিয়া-ফাঙ্গাস ও রান্নার ধোঁয়া- সংক্রমণকে ঘরের ভেতর আটকে রাখছে। এ ছাড়া সামান্য সর্দি-কাশিতেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের আত্মঘাতী প্রবণতা শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্যাথোজেনের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে ঘুমহীনতা, মানসিক চাপ ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের অনিয়ম ইমিউন সিস্টেমকে আরো এলোমেলো করে দিচ্ছে। ফলে ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর বা কাশি রিল্যাক্স করছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদি ধকল তৈরি করছে।
বলা বাহুল্য, সামান্য সর্দি-কাশিতেই ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খাওয়ার প্রবণতা শরীরকে পঙ্গু করে তুলছে। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভাইরাসের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে এবং সাধারণ জ্বরও দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তিতে রূপ নিচ্ছে। এই নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় নগর ও রাষ্ট্র পর্যায়ে জরুরি ত্রিমুখী রূপরেখা বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। এ জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্মাণকাজ ও রাস্তার ধুলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি নিতে এবং নগরবাসীর জন্য সচেতনতামূলক গাইডলাইন প্রকাশ করতে হবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও আইডিসিআরের তত্ত্বাবধানে কমিউনিটিভিত্তিক রেসপিরেটরি সার্ভিলেন্স চালিয়ে প্রকৃত প্যাথোজেন ও ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সের ধরন চিহ্নিত এবং হাসপাতালগুলোয় যৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রটোকল নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে- অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া, অন্দরসজ্জায় ভেন্টিলেশন বৃদ্ধি করা এবং মাস্ক ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, জনস্বাস্থ্য শুধু হাসপাতাল সামলানো নয়; নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা সংশোধনেরও প্রশ্ন। সময়মতো কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা শ্রমঘণ্টা নষ্ট করার পাশাপাশি জাতির সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আমাদের প্রত্যাশা, ঢাকার ঘরে ঘরে জেদি সর্দি-কাশি-জ্বর মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেবে কর্তৃপক্ষ।
কেএমএএ/আপ্র/১০.০৯.২০২৬