মো. জাহাঈীর আলম, ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা থাকায় এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। ভালো ফলনে যেমন কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে, তেমনি বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় লাভের প্রত্যাশাও বেড়েছে তাদের।
ঘোড়াঘাট উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার একটি পৌরসভা ও চারটি ইউনিয়নে এবার ১৫০ হেক্টর জমিতে দেশি তোষা জাতের পাট চাষ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন নির্ধারণ করা হয়েছে ১১ দশমিক ৯ বেল। মোট উৎপাদন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫২৬ বেল। গত বছর ১২৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল এবং হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ছিল ১০ দশমিক ৬ বেল।
বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাট কাটা, আঁটি বাঁধা, পানিতে জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষক ও শ্রমিকরা। অনেক কৃষক এরই মধ্যে বাজারে পাট বিক্রি শুরু করেছেন।
উপজেলার কালুপাড়া গ্রামের কৃষক হারুনুর রশিদ বলেন, গত বছর প্রতি মণ পাট ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন। এ বছর ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে পাট বিক্রি করছেন।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ জমিতে কাটা পাটের আঁটি রাখা হয়েছে। কোথাও কৃষকরা পাটের আঁটি পানিতে জাগ দিচ্ছেন, আবার কোথাও জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে শুকানো হচ্ছে।
কৃষকরা জানান, অন্যান্য ফসলের তুলনায় পাট চাষে খরচ তুলনামূলক বেশি। তবে এবার ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদন খরচ উঠে লাভের মুখ দেখার আশা করছেন তারা। তাদের মতে, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারদর পাওয়া গেলে পাট চাষ লাভজনক হবে।
এক পাটচাষি বলেন, “এবার জমিতে পাট বেশ ভালো হয়েছে। গাছের উচ্চতা ও আঁশের মানও ভালো। ফলন ভালো হওয়ায় আমরা খুশি। এখন বাজারে যদি ভালো দাম পাওয়া যায়, তাহলে পাট চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব।”
আরেক কৃষক বলেন, “পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়াতে শ্রমিক খরচ অনেক। তারপরও এবার ফলন ভালো হওয়ায় আশা করছি খরচ বাদ দিয়ে কিছুটা লাভ থাকবে।”
কৃষকদের মতে, পাটের ভালো ফলন ধরে রাখতে উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পাট কেনার ব্যবস্থা করা গেলে তারা আরো বেশি লাভবান হবেন।
আরেক কৃষক বলেন, “ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু দাম নিয়ে সবসময় চিন্তায় থাকতে হয়। মৌসুমের শুরুতে দাম ভালো থাকলেও পরে অনেক সময় কমে যায়। সরকার যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে, তাহলে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ আরো বাড়বে।”
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ঘোড়াঘাটে পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ ছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অনেক জমিতেই ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে পাট চাষ, রোগবালাই দমন এবং সঠিক সময়ে পাট কাটার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান বলেন, “চলতি মৌসুমে আবহাওয়া পাট চাষের জন্য বেশ অনুকূল ছিল। ফলে অনেক এলাকায় ভালো ফলন হয়েছে। কৃষকদের পাট কাটার সঠিক সময়, জাগ দেওয়ার পদ্ধতি এবং আঁশের মান ভালো রাখার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”
কৃষকরা বলছেন, বাম্পার ফলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে উন্নতমানের বীজ সরবরাহ, উৎপাদন খরচ কমানো এবং বাজারে স্থিতিশীল ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত বাজারদরই নির্ধারণ করবে এ মৌসুমে পাট চাষ কতটা লাভজনক হয়েছে। তাই ভালো ফলনের পাশাপাশি পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ঘোড়াঘাটের কৃষকরা।
সানা/আপ্র/২৬/৯/২০২৬