ডা. মোঃ তারিকুল ইসলাম লিমন
১. ডেঙ্গুর উৎপত্তি ও বিবর্তিত রূপ: গত ২৭ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের সাধারণ ভাইরাল ফিভার নেই। এর উৎপত্তি এবং ক্লিনিক্যাল ম্যানিফেস্টেশনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পূর্বে ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল ফিভার (তীব্র জ্বর, শরীর ব্যথা)। কিন্তু বর্তমানে আমরা পালস রেট ও ব্লাড প্রেসার কমে যাওয়া, প্লাজমা লিকেজ, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং বিভিন্ন অর্গান ফেইলিওরের মতো মারাত্মক ও জটিল রূপ দেখতে পাচ্ছি। ভাইরাসের সেরোটাইপ পরিবর্তন এবং সেকেন্ডারি ইনফেকশনের কারণে রোগীর অবস্থার খুব দ্রুত অবনতি হচ্ছে, যা ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্টকে আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।
২. বরগুনার অভিজ্ঞতা- ফাইন্ডিংস ও আমাদের পদক্ষেপ: গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় একটি ইন-ডেপথ এপিডেমিওলজিক্যাল ও এন্টোমোলজিক্যাল তদন্ত পরিচালনা করা হয়। সেখানকার মূল ফাইন্ডিংসগুলো ছিল-
অরক্ষিত পানি সংরক্ষণ: উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাবে ড্রাম বা বালতিতে বৃষ্টির পানি জমিয়ে রাখা হয়, যা ছিল এডিস মশার প্রধান প্রজননক্ষেত্র।
বর্জ্য অব্যবস্থাপনা: যত্রতত্র আবর্জনা; বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানের পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ব্যানার ও পোস্টারে পানি জমে থাকা।
তথ্য ঘাটতি: তদন্তে দেখা যায়, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি পজিটিভ কেস সরকারি রেকর্ডে আসছিল না, কারণ রোগীরা প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে ঘঝ১ টেস্ট করে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
সুরক্ষার অভাব: মশারির ব্যবহার ছিল আশঙ্কাজনকভাবে কম।
কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল: ২৫০ শয্যার বরগুনা সদর হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে আট চিকিৎসক ও দুই কনসালট্যান্ট কে সংযুক্ত করা হয়। কেস ইনভেস্টিগেশন, ভার্বাল অটোপসি এবং কমিউনিটি লেভেলে রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করা হয়। মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি লোকাল পৌরসভার সাথে যুক্ত হয়ে ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
বর্তমান অবস্থা: সচেতনতা বৃদ্ধি এবং লোকাল অ্যাডভোকেসির কারণে সেখানকার মানুষ এখন পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পূর্বের চেয়ে সতর্ক। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কেস ম্যানেজমেন্ট সক্ষমতা বেড়েছে এবং পরিস্থিতি বর্তমানে নজরদারির আওতায় রয়েছে।
৩. বরগুনা মডেলে সারাদেশের জন্য প্রস্তাবনা: বরগুনার এই অভিজ্ঞতা থেকে সারা দেশের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি-
রিয়েল-টাইম সার্ভিল্যান্স: নিয়মিত এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভিল্যান্স (ইও, ঈও, ঐও, চও ইনডেক্স) চালিয়ে মশার ঘনত্বের ডেটা আপডেট করা এবং সে অনুযায়ী জোনভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রাইভেট সেক্টরকে যুক্ত করা: আন্ডার-রিপোর্টিং রোধে দেশের সকল প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে সিভিল সার্জনের সাথে সমন্বয় করে ডেঙ্গু পজিটিভ কেস রিপোর্ট করা বাধ্যতামূলক করা।
উপজেলা পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি: রেফারেল সিস্টেম উন্নত করা এবং উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সগুলোকে ডেঙ্গু কেস ম্যানেজমেন্টের জন্য প্রস্তুত করা।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
কেএমএএ/আপ্র/০৪.০৭.২০২৬