মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার
সমাজের ভিত্তি কেবল অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা উন্নয়ন নয়; এর গভীরে থাকে মূল্যবোধ, আদবকায়দা ও শালীনতা। একজন মানুষ কতটা শিক্ষিত, তা শুধু তার ডিগ্রি দিয়ে নয়- তার আচরণ, কথাবার্তা এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে। বিশেষ করে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রতি সম্মান এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে সংযম এসবই একটি সভ্য সমাজের অপরিহার্য উপাদান।
শালীনতা বলতে আমরা বুঝি এমন এক আচরণ, যেখানে ভাষা, ভঙ্গি ও মনোভাব সবকিছুতেই থাকে সংযম, ভদ্রতা ও সম্মান। শালীনতা মানে শুধু চুপ থাকা নয়; বরং নিজের মতামত প্রকাশ করেও অন্যকে অসম্মান না করা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো শিক্ষক ভুল করলে তাকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য না করে যুক্তি দিয়ে তার ভুল ধরিয়ে দেওয়াটাই শালীনতা। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু তার ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা শালীনতার পরিপন্থী।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের মত প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই মাধ্যমটি অনেক ক্ষেত্রে শালীনতা হারানোর জায়গায় পরিণত হচ্ছে; বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে ট্রল, ব্যঙ্গ এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ‘হেলিকপ্টার মিলন’ বা এ ধরনের মন্তব্য শুধু একটি ব্যক্তিকে নয়, একটি দায়িত্বশীল পদকেই অসম্মান করে। প্রশ্ন হলো এ ধরনের আচরণ কি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই?
আমরা ভুলে যাই, একজন শিক্ষামন্ত্রী বা যে কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়; বরং দেশের জন্য কাজ করেন। তিনি হয়তো সব সিদ্ধান্তে নিখুঁত নন, সমালোচনার সুযোগ অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি শালীনতার সীমা অতিক্রম করে কুরুচিতে পরিণত হয়, তাহলে তা আর গঠনমূলক থাকে না; বরং তা সমাজে নেতিবাচক সংস্কৃতি তৈরি করে। একজন উচ্চশিক্ষিত, দায়িত্বশীল ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিকে নিয়ে অবমাননাকর ভাষায় কথা বলা আমাদের নিজেদের মূল্যবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় যে চিন্তাশীল, সেটিও তাঁর কাজের মাধ্যমে বোঝা যায়। তিনি কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের দিকেও দৃষ্টি রাখছেন। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ এসব বিষয় তার পরিকল্পনার অংশ। একটি শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলাতে হলে শুধু নিয়ম পরিবর্তন করলেই হয় না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। এই জায়গায় তার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে এটাও সত্য যে, পরিবর্তনের পথ কখনোই সহজ নয়। নতুন কিছু করতে গেলে ভুল হতে পারে, সমালোচনা আসতে পারে, বিতর্ক তৈরি হতে পারে। কিন্তু এসবের মধ্য দিয়েই একটি ভালো ব্যবস্থা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে।
এখানে আমাদের দায়িত্ব হলো শালীনতা বজায় রেখে গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং ভালো উদ্যোগগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া। শালীনতার একটি বড় উদাহরণ আমরা পরিবার থেকেই শিখি। ছোটবেলায় আমাদের শেখানো হয় বড়দের সামনে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা যাবে না, অসম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, কারো ভুল দেখলে তা ভদ্রভাবে বলতে হবে। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে ওই শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনেকেই মনে করেন, পরিচয় গোপন থাকলে যে কোনো কিছু বলা যায়। অথচ বাস্তবে এটি আমাদের ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন।
ধরা যাক, একজন ছাত্র পরীক্ষার কোনো সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট। কিন্তু পরীক্ষায় নকল করতে দেয়া হবে না এটা সবাই চায় বা চাই। এ বিষয়ে আমিও শিক্ষকতা জীবনে আপোষ করি নাই যাহোক কোন পয়েন্ট এ মন খারাপ হলে যুক্তি দিয়ে বলতে পারে ‘এই সিদ্ধান্তে আমাদের কিছু সমস্যা হচ্ছে, আমরা পুনর্বিবেচনা চাই।’ এটি একটি শালীন ও গ্রহণযোগ্য উপায়। কিন্তু যদি সে বলে ‘এটা একটা হাস্যকর সিদ্ধান্ত- যারা নিয়েছে তারা অযোগ্য’; তাহলে তা আর শালীন থাকে না। একই বক্তব্য, কিন্তু ভাষার পার্থক্যই নির্ধারণ করে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
সমাজে শালীনতা কমে গেলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয়। প্রথমত, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হয়। দ্বিতীয়ত, গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। তৃতীয়ত, তরুণ প্রজন্ম ভুল বার্তা পায় তারা মনে করে, কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করাই যেন আধুনিকতা বা সাহসিকতার পরিচয়। অথচ বাস্তবতা হলো, সত্যিকারের সাহস হলো শালীনতা বজায় রেখে নিজের মতামত প্রকাশ করা।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা ও অপমান এক জিনিস নয়। সমালোচনা হলো উন্নতির পথ দেখানো আর অপমান হলো কাউকে ছোট করা। একজন শিক্ষামন্ত্রী যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেন, সেটি ভুল হতে পারে তখন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো যুক্তিসঙ্গতভাবে তার সমালোচনা করা। এ প্রসঙ্গে আমার ব্যাক্তিগত অভিমত হলো তিনি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে মেধাবী গুরুত্ব দিয়েছেন, নকল প্রতিরোধ করারবপ্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সব গুলো ই যথাযথ করেছেন কারন তিনি তার বিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে দেখছেন। তারা তিনি একজন উচ্চ শিক্ষিত ডক্টরেট ডিগ্রী সম্পন্ন মন্ত্রী কিন্তু তাকে নিয়ে হাস্যরসের নামে অবমাননা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বর্তমানে দেখা যায়, কিছু মানুষ সামাজিক মাধ্যমে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নিয়ে নেতিবাচক প্রচার চালায়, আবার কিছু মানুষ তাদের ভালো কাজের প্রশংসাও করে। এই দ্বৈত চিত্র আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন তোলে আমরা কোন পথে যাব? আমরা কি কুরুচি ও অবমাননার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করব, নাকি শালীনতা ও সম্মানের পথ বেছে নেব?
তরুণ প্রজন্মের জন্য এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। প্রথমত, যে কোনো মতামত দেওয়ার আগে ভাবতে হবে এটি কি শালীন? দ্বিতীয়ত, সমালোচনা করতে হলে যুক্তি ব্যবহার করতে হবে, ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। তৃতীয়ত, বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে, এমনকি মতভেদ থাকলেও। চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে এটি বিনোদনের জায়গা হলেও এটি আমাদের পরিচয়ের একটি অংশ। পঞ্চমত, ভালো কাজের প্রশংসা করতে শিখতে হবে শুধু নেতিবাচক দিক নয়; ইতিবাচক দিকও তুলে ধরতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, শালীনতা কোনো দুর্বলতা নয়; এটি একটি শক্তি। এটি আমাদের ব্যক্তিত্বকে উন্নত করে, সমাজকে সুস্থ রাখে এবং পারস্পরিক সম্পর্ককে দৃঢ় করে। আমরা যদি সত্যিই একটি সুন্দর, সভ্য ও মানবিক সমাজ গড়তে চাই, তাহলে আমাদের প্রত্যেককে আদব কায়দা শালীনতা ও শিষ্টাচারের চর্চা করতে হবে। সমালোচনা থাকবে, মতভেদ থাকবে কিন্তু সবকিছুই হতে হবে সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। কারণ, মর্যাদা ও সম্মানবোধই সভ্যতার মূল ভিত্তি, আর শালীনতাই সেই ভিত্তিকে শক্ত করে ধরে রাখে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ময়মনসিংহ
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
কেএমএএ/আপ্র/০৩.০৭.২০২৬