ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর চার মাস পর তার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এর আগে সরকার শুধু শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছিল, যা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছিল।
শুক্রবার (৩ জুলাই) তেহরানে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরকারের এ অবস্থান তুলে ধরেন।
বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মর্মান্তিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি তার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে জাতীয় শোকের এ সময়ে ইরানের সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সহমর্মিতার কথাও জানান তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার শুরুতে নিজ বাসভবনে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ওই সময় ব্যাপক হামলার মধ্যে ইরানও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন আরব দেশে পাল্টা হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকার কারণে দেশগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছিল তেহরান।
খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে অংশ নিতে বৃহস্পতিবার তেহরানে পৌঁছান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
হামলার পরদিন দেওয়া এক বিবৃতিতে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানালেও ইরানের ওপর হামলা বা খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের হত্যার বিষয়টি উল্লেখ করেনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে ২ মার্চ দেওয়া আরেক বিবৃতিতে সরকার খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় মর্মাহত হওয়ার কথা জানায়। তবে তখনও হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানানো হয়নি।
সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির লঙ্ঘন করে পরিচালিত লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডে বাংলাদেশ সরকার মর্মাহত। একই সঙ্গে ইরানের জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়ে সরকার বলেছিল, সংঘাত নয়, বরং সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমেই বিরোধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
সরকারের ওই অবস্থানের পর ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রাহিমি জাহানাবাদী বলেছিলেন, তেহরান বাংলাদেশের কাছে যুদ্ধের রসদ নয়, বরং আক্রান্ত দেশ হিসেবে সমর্থন প্রত্যাশা করে।
এরপর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব আনা হয়। একই সময়ে ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লেখা চিঠি নিয়ে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সফর করেন তার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
শুক্রবারের বৈঠকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশ ও ইরানের কয়েক শতাব্দীর বন্ধুত্ব, দুই দেশের গভীর সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং মানুষে-মানুষে যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের গঠনমূলক ভূমিকাকে সাধুবাদ জানান বাংলাদেশের স্পিকার। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ চুক্তি ইরানের জনগণ এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।
চলমান শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সব পক্ষ সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোর স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাবে।
বৈঠকে ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিতে বৃহস্পতিবার তেহরানে যান স্পিকার। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান ইরানের ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজি বাবাই।
প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাকে বিদায় জানাতে ছয় দিনের কর্মসূচি নিয়েছে ইরান সরকার। শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় খামেনির মরদেহ রাখা হয়। শনিবার সেখানে জানাজার আয়োজন করা হবে।
এদিকে তেহরান সফররত জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা শুক্রবার খামেনির কফিনের সামনে দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জামায়াতে ইসলামী জানায়, আয়াতুল্লাহ আলি হুসাইনি খামেনির জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য এবং ১১ দলীয় জোটের নেতারা অংশ নিয়েছেন। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলটির নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান।
খামেনির স্মরণ ও শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে রাশিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও বিদেশি প্রতিনিধিরাও শুক্রবার তেহরানে পৌঁছান।
শনি ও রোববার ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দিন জানাজায় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
সোমবার তেহরানে প্রধান শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এতে খামেনির কফিনের পাশাপাশি একই হামলায় নিহত তার মেয়ে, জামাতা, পুত্রবধূ এবং নাতনির মরদেহও বহন করা হবে।
শোকযাত্রা শেষে খামেনির মরদেহ নেওয়া হবে ইরানের শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্র ও ধর্মীয় শিক্ষানগরী কোমে। সেখানে মঙ্গলবার জানাজা ও শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর বুধবার তার কফিন নেওয়া হবে প্রতিবেশী ইরাকে। নাজাফ ও কারবালা শহরে শোকযাত্রা ও জানাজায় ইরানের সমমনা ও মিত্র শিয়া গোষ্ঠীগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নেবেন।
সবশেষে বৃহস্পতিবার ইরানের মাশহাদ শহরে আরেকটি শোভাযাত্রা শেষে হযরত ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে।
সানা/আপ্র/৩/৭/২০২৬