কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে তীব্র সংঘাত ও বিমান হামলার ঘটনায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
গত বুধবার (১ জুলাই) ও বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) টানা দুই দিন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এতে টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকায় বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে ঘরবাড়ি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে। শুক্রবার (৩ জুলাই) মংডু শহরের ভেতরে সংঘর্ষ হলেও এপারে বড় ধরনের শব্দ শোনা যায়নি।
উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, মিয়ানমারের বিমান হামলায় সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সংঘাতের কারণে তাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আলীখালী ক্যাম্পের শরণার্থী আজগর আলী বলেন, “মংডু শহরে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। এতে রোহিঙ্গা মুসলিমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সংঘাত আরো তীব্র হতে পারে।”
আরেক রোহিঙ্গা ইদ্রিস মিয়া বলেন, “সেখানে পরিস্থিতি এখন খুবই উত্তপ্ত। অনেক রোহিঙ্গা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।”
শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, “বিস্ফোরণের তীব্রতায় সীমান্তের ওপারের ঘরবাড়ি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে।”
হোয়াইক্যং সীমান্তের বাসিন্দা আব্দুল গফুর বলেন, “সীমান্তে সংঘাত শুরু হলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক বছর আগে গুলি এসে আমাদের ঘরেও আঘাত হেনেছিল।”
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। টহল, নৌ টহল ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এর আগে বুধবার ও বৃহস্পতিবার টেকনাফ সীমান্তে টানা বিস্ফোরণের শব্দে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে একাধিক বিস্ফোরণে স্থানীয়রা ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বের হয়ে আসেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক দুই দিনে প্রায় ৩০টি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। এতে কয়েকটি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘ কয়েক মাসের তুলনামূলক স্থিতিশীলতার পর রাখাইনে ফের সংঘাত তীব্র হওয়ায় সীমান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ও স্থানীয় জীবিকার ওপর।
রাখাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, বুধবার মিয়ানমার সেনাবাহিনী যুদ্ধবিমান ও ওয়াই-১২ উড়োজাহাজ ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলা চালায়।
বিজিবি জানায়, সীমান্তের ওপারের পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশ অংশে আতঙ্ক তৈরি হলেও সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের পর আরাকান আর্মি রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরবর্তীতে নতুন করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হামলা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাতে অঞ্চলটি আবারো অস্থির হয়ে ওঠে।
সানা/আপ্র/৩/৭/২০২৬