গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

তিন দশকের খুনের রহস্য ভাঙলো জিনগত বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি ডেস্ক

প্রকাশিত: ০০:৪৭ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০২:০৫ এএম ২০২৬
তিন দশকের খুনের রহস্য ভাঙলো জিনগত বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ছবি

গেল বছর মামলার জট খুলতে এই নতুন উদ্ভাবনী কৌশল নিয়েছেন গোয়েন্দারা -ছবি ম্যাগনিফিক

যুক্তরাষ্ট্রে তিন দশক আগের একটি অমীমাংসিত হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অপরাধস্থলে পাওয়া জিনগত নমুনা বিশ্লেষণ, বংশগত যোগসূত্র অনুসন্ধান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত তদন্তপদ্ধতিতে কোনো অগ্রগতি না হওয়া মামলাটিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ নতুন দিশা দেখিয়েছে তদন্তকারীদের।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালের ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের গ্রানাইট সিটিতে ৩৪ বছর বয়সি র‌্যান্ডি গেইল স্পেরিনোকে একটি পিকআপ ট্রাকে উঠতে দেখা যায়। কয়েক ঘণ্টা পর পাশের একটি মাঠ থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আঘাতের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে সে সময় নিশ্চিত হন তদন্তকারীরা।

অপরাধস্থল থেকে পাওয়া জিনগত নমুনা তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচলিত তথ্যভান্ডারে থাকা নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলেও কোনো সাফল্য আসেনি। ম্যাডিসন কাউন্টির শেরিফ কার্যালয়ের গোয়েন্দারা শত শত মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালিয়েও হত্যাকারীর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে আড়াই লাখের বেশি অমীমাংসিত হত্যা মামলার বিশাল তালিকায় একপর্যায়ে হারিয়ে যেতে বসেছিল স্পেরিনো হত্যাকাণ্ডের তদন্ত।

গত বছর মামলাটির জট খুলতে নতুন কৌশল নেন গোয়েন্দারা। অপরাধস্থল থেকে পাওয়া জিনগত নমুনা পাঠানো হয় টেক্সাসের হিউস্টনভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অথরামের কাছে। পুরনো ও জটিল অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটনে আধুনিক জিনগত বিশ্লেষণ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি।

বংশগত সূত্রে শনাক্ত অপরাধী: তদন্তে ব্যবহার করা হয় বংশগত সূত্র ধরে অপরাধী শনাক্ত করার একটি বিশেষ পদ্ধতি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচিত ‘গোল্ডেন স্টেট কিলার’ হিসেবে পরিচিত জোসেফ জেমস ডিয়্যাঞ্জেলোকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছিল।

প্রচলিত ফরেনসিক পরীক্ষায় সাধারণত সন্দেহভাজনের জিনগত নমুনার সঙ্গে অপরাধস্থল থেকে পাওয়া নমুনা মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু বংশগত সূত্র অনুসন্ধানের পদ্ধতিতে অপরাধীর দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের বাণিজ্যিক বংশানুক্রমিক তথ্যভান্ডারে জমা দেওয়া জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র খুঁজে বের করা যায়। এর মাধ্যমে সরাসরি নমুনার মিল না থাকলেও অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

অথরাম এই পদ্ধতিতে সম্ভাব্য বংশগত যোগসূত্র বের করে। পরে সেই সূত্র ধরে তদন্তকারীরা ৭০ বছর বয়সি আলবার্ট ‘বাডি’ জিগলারকে শনাক্ত করেন এবং গ্রেফতার করেন। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন। চলতি বছরের মে মাসে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়।

ম্যাডিসন কাউন্টি শেরিফ কার্যালয়ের ক্যাপ্টেন টিম লরেন্স বলেন, একটি সূত্রই মুহূর্তের মধ্যে পুরো মামলার গতিপথ বদলে দিয়েছিল। নিহত গেইলের ছেলে ওয়েস স্পেরিনো সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দীর্ঘ সময় পর হত্যাকারীর পরিচয় জানতে পেরে তিনি অবশেষে স্বস্তি পেয়েছেন।

দুই হাজার পৃষ্ঠার নথি বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: তদন্তের অগ্রগতিতে শুধু জিনগত প্রযুক্তিই ভূমিকা রাখেনি। তিন দশকে জমা হওয়া বিপুল নথি, সাক্ষীদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এ কাজে তদন্তকারীরা ফ্লোরিডাভিত্তিক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রালস্কয়ারের ‘সেন্টারলাইন এআই’ ব্যবস্থা ব্যবহার করেন।

এ ব্যবস্থার সাহায্যে দুই হাজারের বেশি পৃষ্ঠার নথি বিশ্লেষণ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চিহ্নিত, ঘটনার সময়রেখা পুনর্গঠন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সুবিন্যস্ত করা হয়। ক্যাপ্টেন লরেন্স বলেন, একজন গোয়েন্দার পক্ষে বসে দুই হাজার পৃষ্ঠা পড়ে তথ্য বের করার চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় অনুসন্ধান করা সহজ ও কার্যকর। কথোপকথনভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রশ্ন করে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নেন তদন্তকারীরা।

জিগলারকে শনাক্ত করার পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। তবে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে লরেন্স বলেন, শেষ পর্যন্ত সন্দেহভাজনকে খুঁজে বের করা, তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব মানুষেরই।

সাফল্যের পাশাপাশি গোপনীয়তা ও অর্থায়নের প্রশ্ন: বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও পরিচয়হীন মরদেহ শনাক্তকরণে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অথরামের দাবি, তাদের ব্যবস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার জটিল মামলার সমাধান হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ডেভিড মিটেলম্যান বংশগত সূত্র অনুসন্ধানকে বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয়ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষায়, জিনগত পরিচিতি সম্ভাব্য অবস্থানের সংকেত দেয়; কিন্তু সেই সংকেতের অর্থ বুঝতে প্রয়োজন একটি মানচিত্র। বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা সরকারি নথি, শোকসংবাদ এবং আদমশুমারির তথ্য ব্যবহার করে পরিবারের বংশতালিকা ও পারস্পরিক সম্পর্কের সেই মানচিত্র তৈরি করেন। তবে জিনগত সূত্র পাওয়ার পরও পর্যায়ক্রমে তদন্ত চালানো অপরিহার্য।

এই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অপরাধস্থলে জিনগত নমুনা না পাওয়া গেলে এ পদ্ধতি প্রয়োগের সুযোগ থাকে না। আবার প্রযুক্তির ব্যবহার মানেই অপরাধী শনাক্ত হওয়ার নিশ্চয়তা নয়।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। অথরাম জানিয়েছে, তারা কেবল সেই বাণিজ্যিক তথ্যভান্ডারের তথ্য ব্যবহার করে, যেখানে গ্রাহকেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। তবে লন্ডনের কিংস কলেজের ফরেনসিক জিনতত্ত্বের অধ্যাপক ডেনিস স্নাইডারকম্ব কোর্টের মতে, একজন ব্যক্তি নিজের জিনগত তথ্য ব্যবহারের সম্মতি দিলেও তাঁর আত্মীয়দের সম্মতি নাও থাকতে পারে। ফলে এ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বড় বাধা অর্থায়নের সংকট। মিটেলম্যান বলেন, অনেক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাইলেও পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ নেই। অনেক ক্ষেত্রে অনুদান ও জন-অর্থায়নের মাধ্যমে তদন্তের ব্যয় মেটানো হয়। এ উদ্দেশ্যে অথরাম একটি ওয়েবসাইট পরিচালনা করে, যেখানে অর্থায়নের অপেক্ষায় থাকা মামলার তালিকা প্রকাশ করা হয় এবং আগ্রহীরা অর্থ দিয়ে তদন্তে সহায়তা করতে পারেন।
সানা/আপ্র/২৪/১০/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার শঙ্কা
২৪ অক্টোবর ২০২৬

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটিতে বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার শঙ্কা

ওয়েবসাইট তৈরি ও পরিচালনায় বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্...

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম যাত্রীবাহী ড্রোন চালুর পথে শ্রীলঙ্কা
২২ অক্টোবর ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম যাত্রীবাহী ড্রোন চালুর পথে শ্রীলঙ্কা

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথমবারের মতো যাত্রীবাহী ড্রোন সেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে শ্রীলঙ্কা। এ উদ্যোগের অংশ...

প্রযুক্তি ও ধনকুবেরদের নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব, বাড়ছে নতুন ঝুঁকি
২২ অক্টোবর ২০২৬

প্রযুক্তি ও ধনকুবেরদের নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব, বাড়ছে নতুন ঝুঁকি

ভূরাজনীতি থেকে সংস্কৃতি - বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, তথ্যপ্রবাহ ও সৃজনশীলতার ওপর প্রযুক্তি ধনক...

গুগল প্লে স্টোরে আসল-নকল অ্যাপ চেনার সহজ উপায়
১৮ অক্টোবর ২০২৬

গুগল প্লে স্টোরে আসল-নকল অ্যাপ চেনার সহজ উপায়

স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য গুগল ক্রোম অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ব্রাউজার। এই জনপ্রিয়তাকে কাজে ল...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল বিশৃঙ্খলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: প্রধানমন্ত্রী

দেশের বিভিন্ন স্থানে ও কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে পলাতক স্বৈরাচার ও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে তাঁর কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে দাবি করে তিনি বলেছেন, এক পক্ষ সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে, অন্য পক্ষ দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রিয় পাঠক, আপনি কি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 2 দিন আগে