সৌদি আরবে ‘অনৈতিক কাজে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেল পাঁচটায় রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন’ আয়োজিত এ সমাবেশে প্রবাসীদের সুরক্ষা, আইনি সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বক্তারা।
সমাবেশে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বলেন, প্রবাসী দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর পরিস্থিতি তৈরি হলেও সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা আগের ফ্যাসিস্ট সরকারগুলোর তুলনায় আরো নৃশংস, জঘন্য, আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক।
তিনি বলেন, “সরকারকে পরিষ্কার করে বলতে হবে, এই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যারা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে সরকার কী ভূমিকা নেয়? আগামী সাত দিনের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে সরকার কী ভূমিকা নেয়, এইটা আমরা দেখতে চাই।”
হাসনাত কাইয়ুম আরো বলেন, সাত দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সরকারের মন্ত্রীদের অপসারণের দাবিতে আন্দোলন শুরু করা হবে।
প্রবাসীদের সুরক্ষায় সরকারের পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দাবি করে তিনি বলেন, “প্রবাসে যারা আছেন, যারা মামলায় ভুগছেন, যারা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হচ্ছে, তাদের পক্ষে আপনারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন, এইটা আগামী সাত দিনের মধ্যে বাংলাদেশকে এবং প্রবাসীদের জানাতে হবে।”
সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠাবেন কি না, তা বিবেচনা করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অল্টারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন বলেন, সৌদি সরকার দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের আগে কোনো ধরনের জবাবদিহির প্রয়োজন মনে করেনি। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নারী শ্রমিকদের নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়ে দেশে ফিরতে হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি সরকার বাংলাদেশকে না জানিয়ে কীভাবে এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, তার জবাব চাইতে হবে।
তাজনূভা জাবীন প্রশ্ন তোলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ওই দুই বাংলাদেশি কারাগারে থাকলেও তাঁরা কেন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা পাননি। তাঁর ভাষ্য, একজন বাংলাদেশি নাগরিক ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে থাকলেও তাঁর সঙ্গে কোনো কনস্যুলার কর্মকর্তা যোগাযোগ করেননি এবং তিনি আইনি সহায়তাও পাননি। অথচ ঘটনার নিন্দা জানানোর পরিবর্তে সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের মরদেহকে ‘পাপের লাশ’ বলা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
সমাবেশে গবেষক মাহা মির্জা বলেন, প্রবাসী শ্রমিকেরা শুধু অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নন। তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া বাংলাদেশ সরকার ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা প্রকাশ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
মাহা মির্জা বলেন, “এই জবাবদিহিতার আওতায় আনাটা খুব জরুরি, কারণ আমরা চাই না আগামী চার বছরে আবার ৩০ হাজার কফিন ফিরুক।”
প্রবাসে কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের তালিকা তৈরি, তাঁদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি। এ জন্য দূতাবাসের কর্মীদের মাধ্যমে কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের তালিকা ও তথ্যভান্ডার তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
এ ছাড়া ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর পর তাঁদের অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখে- এমন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান মাহা মির্জা। প্রয়োজনে পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়া সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনারও আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা, দূতাবাসের সহায়তা এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর ঘটনায় সরকারের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি। সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি এবং প্রবাসীদের নিরাপত্তায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
সানা/আপ্র/২৪/১০/২০২৬