জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণের প্রশংসা করেছেন দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিক। তাদের মতে, ভাষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্র পুনর্গঠন, রোহিঙ্গা সংকট, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন তারা।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বাংলাদেশ পুনর্গঠন, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা এবং বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতায় দেশের ভূমিকা জোরদারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। সরকারের পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন—এই তিন কৌশলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের কারণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এমন একটি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দেশ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, সরকারের তিন কৌশল বাস্তবায়নে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় কর আদায়ের অনুপাত তিন শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়াতে হবে।
মাহবুব উল্লাহর মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝাও ক্রমে বাড়ছে। আগামী বছরগুলোতে ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ উন্নয়ন কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা হলে তা অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
জাতীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যাংক খাতের সংস্কারের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ধনী দেশগুলোর সহায়তাকে প্রধান উপায় হিসেবে চিহ্নিত না করে দেশের নিজস্ব উদ্যোগ ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটিকে তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের তাগিদ
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার কথা উল্লেখ করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান দেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে দীর্ঘদিনেও সমাধান না হওয়ায় নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।
তার মতে, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার কারণে রোহিঙ্গা সংকট এখন আরো বিস্তৃত আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
নুরুল আমিন বেপারী আরও বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অতীতে দেওয়া কোনো আশ্বাসই এখন পর্যন্ত টেকসই সমাধান আনতে পারেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানও প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন। তার মতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরা আগেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিয়েছেন। তবে এবারের ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দেশের অবস্থান বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, জনগণের ক্ষমতায়নের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করার অঙ্গীকার আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার বিষয়টিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্বশান্তি ও সংলাপের ওপর গুরুত্ব
ড. কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, সরকারের পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন কৌশল এবং যুদ্ধবিগ্রহের বিরোধিতা শান্তি ও পুনর্গঠনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার তুলে ধরেছে।
তার মতে, প্রধানমন্ত্রী সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
জাতীয় দৈনিক ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’-এর সম্পাদক মারুফ কামাল খান বলেন, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিশ্বশান্তির প্রতি বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
তিনি ভাষণটিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেও মন্তব্য করেন।
মারুফ কামাল খান জানান, প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি এবং বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে থাকবে।
পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার বিষয়টিও উল্লেখ করেন মারুফ কামাল। তিনি বলেন, ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তন, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন, শিশুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনায় এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
বাংলায় ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রশংসা
প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, বাংলায় দেওয়া ১৭ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং শক্তিশালী বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
তার মতে, রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশগত সমস্যা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের মতো বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
আবদাল আহমদ বলেন, ভাষণে জুলাই আন্দোলন এবং গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে সরকারের তিন কৌশল উপস্থাপন করেছেন।
তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনৈতিক সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি সামরিক খাতের ব্যয় উন্নয়নমূলক খাতে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আবদাল আহমদের মতে, ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর জিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলায় দেওয়া এটি তৃতীয় ভাষণ।
প্রতিবেদনে উঠে আসা কয়েকজন সাধারণ নাগরিকের প্রতিক্রিয়াতেও বাংলায় ভাষণ দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রশংসা পাওয়া গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামজিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে তার প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছে। এ কারণে তিনি গর্বিত বোধ করছেন।
রাজধানীর নীলক্ষেতের দোকানি মোহাম্মদ শাহীন জানান, সাধারণ বাংলাদেশিদের উদ্বেগের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার উদ্যোগ তার ভালো লেগেছে।
পথচারী মোহাম্মদ জসিমও বাংলাদেশের মর্যাদা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রোহিঙ্গা সংকটের ওপর ভাষণে গুরুত্ব দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপের পথ খোলা রাখার কথা জানান।
আন্তর্জাতিক বিরোধ নিরসনে সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতাকেই বাংলাদেশের অবস্থান হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
এসি/আপ্র/২৭/৯/২০২৬