বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্থনৈতিক সংযোগ, জলবায়ু পরিবর্তন ও সুশাসন নিয়ে আন্তর্জাতিক সংলাপ ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’ শুরু হচ্ছে শনিবার। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এ আয়োজনে বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশের নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের চিত্রা হলে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান। তিনি জানান, সিজিএস আয়োজিত আন্তর্জাতিক এ সংলাপের এবার পঞ্চম আসর। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস : নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’।
আয়োজকেরা জানিয়েছেন, এবারের আয়োজনে ১০০টির বেশি দেশের প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী থাকবেন। এতে সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উদ্ভাবক ও তরুণ নেতারা অংশ নেবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংলাপের উদ্বোধন করবেন এবং উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন।
জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্বে নতুন নতুন প্রভাববলয় তৈরি হচ্ছে, নতুন জোট গড়ে উঠছে এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে নিজেদের অবস্থান ও সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বিভিন্ন দেশ। এসব পরিবর্তনকে সামনে রেখেই এবারের কর্মসূচি সাজানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ শুধু বাংলাদেশের আরেকটি সম্মেলন নয়; এটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষকে শুধু একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য নয়, বরং বিশ্বকে প্রভাবিত করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে অর্থবহ আলোচনায় যুক্ত করাই এ আয়োজনের লক্ষ্য।
জিল্লুর রহমান বলেন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, জলবায়ু সহনশীলতা, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আলোচনায় বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বঙ্গোপসাগর দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বৃহত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে যুক্ত করেছে। ফলে এ অঞ্চলের বিভিন্ন ঘটনার প্রভাব বঙ্গোপসাগরের বাইরেও পড়ছে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করাই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এবারের সংলাপে ছয়টি কৌশলগত বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো - পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতার প্রতিযোগিতা; ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার পরিসর ও তথ্য ক্ষমতা; বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি; জলবায়ু সহনশীলতা ও মানবিক নিরাপত্তা এবং গণতন্ত্র, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা।
কর্মসূচিতে থাকছে পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন, নেতৃত্ব বিষয়ক ফোরাম, কৌশলগত সংলাপ, স্টুডিও কথোপকথন, আমন্ত্রণভিত্তিক গোলটেবিল বৈঠক এবং ছোট পরিসরের বিভিন্ন আলোচনা। বিশেষ আলোচনার মধ্যে রয়েছে ‘দ্য প্রাইম মিনিস্টারস অ্যাড্রেস’, ‘দ্য বে অব বেঙ্গল লেকচার’, ‘হোয়াই দ্য বে ম্যাটারস টু দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘দ্য নিউ স্ট্র্যাটেজিক মিডল’, ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া : পাওয়ার অ্যান্ড প্রুডেন্স’, ‘উইমেন শেপিং দ্য ফিউচার’ এবং ‘দ্য ইয়াং লিডার্স ফোরাম’।
এ ছাড়া এবারের আয়োজনে ‘ডক স্পটলাইট’ নামে নতুন একটি পর্ব রাখা হয়েছে। এতে বক্তারা প্রচলিত দীর্ঘ আলোচনার বাইরে নিজেদের বিশেষ কোনো ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ পাবেন। এসব আলোচনায় ভূরাজনীতি ও সংঘাতের পাশাপাশি সমুদ্র, নেতৃত্ব, আধ্যাত্মিকতা, মানবিকতা ও মানবিক সহনশীলতার মতো বিষয়ও উঠে আসবে।
জিল্লুর রহমান বলেন, একই ধরনের মানুষ বা একই রাজনৈতিক ধারণার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ঘর তৈরি করতে চায় না সিজিএস। বরং ভিন্ন অঞ্চল, পেশা ও মতের মানুষের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও যাতে তা শত্রুতায় পরিণত না হয়, সে ধরনের আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। কারণ স্বস্তিদায়ক আলোচনার চেয়ে কঠিন প্রশ্ন ও মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সিজিএসের প্রেসিডেন্ট বলেন, সিজিএস একটি বেসরকারি, স্বাধীন ও নির্দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সরকার, বিরোধী দল, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করলেও প্রতিষ্ঠানটি কারও অংশ নয়। এই স্বাধীনতাই ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সিজিএসের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ওয়াশিংটন ডিসিতে সিজিএস ইউএসএ কার্যক্রম শুরু করেছে। আগামী বছরগুলোতে ব্রাসেলস ও দুবাইয়ে আরো প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ঢাকাই থাকবে এর কেন্দ্র। বাংলাদেশের শুধু আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশগ্রহণকারী নয়, বরং আন্তর্জাতিক আলোচনার আয়োজক দেশ হিসেবে পরিচিতি তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য।
জিল্লুর রহমান আরো বলেন, পাঁচ বছর আগে এ সংলাপ একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছিল। প্রথম চারটি আয়োজন থেকে অনেক কিছু শেখার পাশাপাশি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আয়োজনের পরিধি ও মান উন্নত করা হয়েছে। এবারের পঞ্চম আসর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী আয়োজন। তবে এর সাফল্য শুধু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দিয়ে মাপা হবে না। আলোচনার বিষয় কতটা গুরুত্বপূর্ণ, কথোপকথন কতটা সৎ এবং অংশগ্রহণকারীরা নতুন কোনো ধারণা নিয়ে ফিরছেন কি না, সেটিই হবে মূল বিষয়।
সংবাদ সম্মেলনে সিজিএসের নির্বাহী পারভেজ করিম আব্বাসী এবং গণমাধ্যম সম্পর্ক ও যোগাযোগ সমন্বয়ক সঞ্জয় দেবনাথ উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/২/১০/২০২৬