বুধবার (৭ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাত থেকে সমুদ্র ও নদীতে ইলিশ ধরার ওপর শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। মা ইলিশের বাধাহীন প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকারের এ সিদ্ধান্তের কারণে ইতোমধ্যে গভীর সমুদ্র থেকে তীরে ফিরতে শুরু করেছেন জেলেরা। পটুয়াখালীর অন্যতম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র মহিপুর-আলিপুর, কুয়াকাটা, রাঙ্গাবালীসহ উপকূলের বিভিন্ন নদনদীতে হাজারো জেলে ফিরে এসেছেন।
তবে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই আবার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আসায় জেলেদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের দাবি, এখনো ইলিশের পেটে ডিম আসেনি। ইলিশের প্রজনন বাড়ানোর লক্ষ্যে মৎস্য অধিদফতরের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছেন তারা। এরপরও সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছেন জেলেরা।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে দেশের জলসীমায় পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেদের অনুপ্রবেশ বন্ধে নৌবাহিনীসহ প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের মধ্যে প্রণোদনা সঠিক সময়ে ও পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়ার দাবিও রয়েছে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞার আগে মৎস্য অবতরণকেন্দ্রগুলোতে চলছে শেষ সময়ের বেচাকেনা। ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম এ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলো এখন সরগরম।
কুয়াকাটা আশার আলো জেলে সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি নিজাম শেখ বলেন, সমুদ্রে মাছ শিকার করতে গিয়ে বেশিরভাগ জেলেই শূন্য হাতে তীরে ফিরছেন। আগের মতো সাগরে মাছ ধরা পড়ছে না। দেশি-বিদেশি ট্রলিং বোটের পাশাপাশি ভারতীয় জেলেদের আধিপত্যও রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে বারবার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে জেলেদের ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জেলে আব্দুর রহিম বলেন, “এমনিতেই সাগরে মাছ পাচ্ছি না, তারপর এখন আবার নিষেধাজ্ঞা। সরকারি আইন মানতেই হবে। তবে সরকার যে প্রণোদনা দেয়, তা সঠিক সময়ে দেয় না, তাও চাহিদার চেয়ে অনেক কম। তাই সব জেলের দাবি, যে চাল দেওয়া হয়, সেটি সঠিক সময়ে ও পরিমাণে আরো বাড়ানো হোক।”
ট্রলারের মাঝি সোলায়মান বলেন, জেলেরা বিভিন্ন এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে জর্জরিত। এর সঙ্গে রয়েছে দাদনের বোঝা। এই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে জেলে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সবাই হতাশায় রয়েছেন।
মহিপুর মৎস্য আড়তদার সমবায় মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান ফজলু গাজী বলেন, গত দুই-তিন বছর ধরে সাগরে মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। যখন কিছুটা মাছের দেখা মিলছে, তখনই খারাপ আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অবরোধের সুযোগে বার্মা ও ভারতীয় জেলেরা দেশের জলসীমায় ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার সমিতির নেতা আব্দুল জলিল ঘরামি বলেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার প্রতি সম্মান রেখে জেলেরা আজ মধ্যরাতের আগেই সমুদ্র থেকে তীরে ফিরে আসবেন। এরই মধ্যে অনেক ট্রলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন আশ্রয়স্থলে নোঙর করে জেলেরা বাড়ি ফিরে গেছেন। তিনি বলেন, চলতি বছর ইলিশের আকাল গেছে। কিছু জেলে মাঝেমধ্যে কিছু মাছ পেলেও তা পর্যাপ্ত নয়। ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে একের পর এক দুর্যোগের কারণে জেলেরা সমুদ্রে যেতে পারেননি। সেই নিষেধাজ্ঞার রেশ কাটতে না কাটতেই ২২ দিনের নতুন নিষেধাজ্ঞা জেলে ও আড়তদারদের হতাশ করেছে। চলতি বর্ষা মৌসুমেও দুর্যোগের কারণে তারা নানা সমস্যার মধ্যে ছিলেন। সমুদ্রে মাছ না থাকায় জেলে ও আড়তদারদের ধারদেনা করে চলতে হয়েছে। এরপরও সরকারের আইন মেনে জেলেরা মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন।
কলাপাড়া সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, মা ইলিশসহ সামুদ্রিক সব ধরনের মাছের প্রজনন মৌসুম চলছে। সমুদ্রে মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এতে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবেন মৎস্যজীবীরাই।
তিনি জানান, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালে কলাপাড়া উপজেলার ১৮ হাজার নিবন্ধিত জেলেকে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। নিবন্ধনের বাইরে থাকা জেলেদেরও পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বাজারজাত করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে বলেও জানিয়েছেন মৎস্য কর্মকর্তা।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৭/১০/২০২৬