ঘুম ভাঙতেই সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অফিসে কাজের ফাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাতে ঘুমানোর আগেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বর্তমান সময়ে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন, যার দৈনন্দিন জীবনে এর কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু যে মাধ্যমটি প্রতিদিন ব্যবহার করছেন, সেটির জন্যও যে একটি বিশেষ দিন রয়েছে, তা কি জানেন? আজ, ৩০ জুন, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিবস।
এই দিবসের উদ্দেশ্য শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা উদযাপন নয়, বরং বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ, তথ্য আদান-প্রদান, শিক্ষা, ব্যবসা এবং সামাজিক পরিবর্তনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরা।
এক সময় দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। এখন পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর কয়েক সেকেন্ডেই পৌঁছে যায় অন্য প্রান্তে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী কিংবা ব্যবসায়িক অংশীদার— সবাইকে একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেছে এই মাধ্যম।
বর্তমানে শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগ নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, শিক্ষা, বিনোদন, জনসচেতনতা এবং সংবাদ প্রচারের অন্যতম বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ছোট উদ্যোক্তারাও এখন এই মাধ্যম ব্যবহার করে নিজেদের পণ্য ও সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। জনপ্রিয় ব্যক্তিরা নিজেদের পরিচিতি বাড়াতে এবং অনুসারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে নিয়মিত এই মাধ্যম ব্যবহার করেন।
করোনা মহামারির সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্ব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লকডাউনের সময় মানুষ এই মাধ্যমেই চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য, জরুরি সহায়তা, অনলাইন শিক্ষা, কর্মক্ষেত্রের যোগাযোগ এবং প্রিয়জনের খোঁজখবর নিয়েছেন। অনেকের জন্য এটি মানসিক সাহস ও সহযোগিতারও বড় একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বিশ্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিবসের যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালে। বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর অবদান তুলে ধরতেই এই দিবস চালু করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। বিশ্বের প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সিক্সডিগ্রিজ চালু হয় ১৯৯৭ সালে। এটি প্রতিষ্ঠা করেন অ্যান্ড্রু ওয়েইনরিচ। অল্প সময়ের মধ্যেই এর ব্যবহারকারী সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। যদিও পরে এটি বন্ধ হয়ে যায়, তবুও আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিত্তি তৈরি করে দেয় এই প্ল্যাটফর্ম।
এরপর ২০০২ সালে আসে ফ্রেন্ডস্টার এবং ২০০৩ সালে চালু হয় লিংকডইন। পরে একে একে আসে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, স্ন্যাপচ্যাটসহ অসংখ্য জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা আজ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬০০ থেকে ৬১২ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৪ থেকে ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫৩.৪ শতাংশ মানুষ সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন এবং দেশে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড মিলিয়ে ইন্টারনেট সংযোগ ১৩ কোটিরও বেশি, যার মধ্যে প্রায় ১১ কোটি ৬০ লাখ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। প্রতিদিন কোটি কোটি ছবি, ভিডিও, মতামত ও তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে শেয়ার হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন মানুষের জীবন সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহারও উদ্বেগের বিষয়। ভুয়া তথ্য, গুজব, সাইবার প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং অতিরিক্ত আসক্তি থেকে দূরে থাকতে সচেতন ব্যবহারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বিশ্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিবস শুধু একটি দিবস নয়, এটি দায়িত্বশীল, নিরাপদ ও ইতিবাচকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বার্তাও বহন করে।
এসি/আপ্র/৩০/৬/২০২৬