বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য ক্রমেই এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। এমন বাস্তবতায় বিশ্বের দুই বৃহত্তম জনবহুল দেশ ভারত ও চীনের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কলকাতায় চীনের কনসাল জেনারেল জু উই। তাঁর মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা গেলে চলমান শতাব্দীকে প্রকৃত অর্থেই ‘এশীয় শতাব্দী’তে পরিণত করা সম্ভব।
২৬ জুন ভারতের দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে জু উই বলেন, বর্তমান বিশ্ব এক জটিল ও অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আধিপত্যবাদ, সংরক্ষণবাদ এবং ভূরাজনৈতিক বিভাজন বিশ্বব্যাপী শান্তি, উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সুশাসনের সংকটকে আরো গভীর করছে। এমন পরিস্থিতিতে ১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও চীনের সম্পর্ক কেবল দ্বিপক্ষীয় সীমারেখায় আটকে নেই; বরং তা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভারত ও চীনের যৌথ অবদান ৪০ শতাংশেরও বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক নানা সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথ নির্ধারণে এই দুই দেশের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দুই দেশ একসঙ্গে এগোতে পারলে প্রাচ্যের এই দুই প্রাচীন সভ্যতা বিশ্বের অন্যতম স্থিতিশীল শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
তবে এই আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে ভারত-চীন সম্পর্ক এখনো জটিল ও বহুমাত্রিক পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বিপুল বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিদ্যমান।
জু উই তাঁর নিবন্ধে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, এই উদ্যোগের লক্ষ্য উন্নয়নকে বৈশ্বিক এজেন্ডার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এমন একটি বিশ্ব গড়ে তোলা, যেখানে কোনো দেশ উন্নয়নের মূলধারা থেকে পিছিয়ে থাকবে না। তিনি দাবি করেন, এই দর্শনের সঙ্গে ভারতের ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ গড়ে তোলার লক্ষ্যও সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ উভয় দেশই উন্নয়নকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া সুবিধা হিসেবে নয়।
নিবন্ধে তিনি বলেন, উন্মুক্ত, পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। এক পক্ষের লাভ মানেই অন্য পক্ষের ক্ষতি—এমন প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সহযোগিতার নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে আধুনিকায়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে।
নিরাপত্তা ইস্যুতেও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন চীনা এই কূটনীতিক। তাঁর মতে, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান, জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার প্রতি আনুগত্য এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তিই টেকসই নিরাপত্তার ভিত্তি। ভারত ও চীন দীর্ঘ সীমান্ত ভাগাভাগি করে বলেই পারস্পরিক আস্থা ও সংলাপের বিকল্প নেই। অন্য দেশের ক্ষতির বিনিময়ে কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী নিরাপত্তা অর্জন করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সভ্যতার প্রশ্নেও দুই দেশের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে জু উই বলেন, হাজার বছরের ইতিহাস বহনকারী ভারত ও চীন জানে যে কোনো একক সংস্কৃতি সত্যের একমাত্র ধারক নয়। সভ্যতার বৈচিত্র্য, পারস্পরিক শিক্ষা ও সংলাপই ভুল বোঝাবুঝি দূর করার সবচেয়ে কার্যকর পথ। তাঁর মতে, এই দর্শন ভারতের ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’—‘সমগ্র বিশ্ব একটি পরিবার’—নীতির সঙ্গেও গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বৈশ্বিক সুশাসন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ন্যায়সঙ্গত ও ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সব দেশের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘের কেন্দ্রীয় ভূমিকা শক্তিশালী করার পাশাপাশি বড় দেশগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা সময়ের দাবি। কোনো দেশকে কৃত্রিমভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সংঘাতই বাড়ায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিবন্ধের শেষাংশে জু উই বলেন, এশিয়ার দুই প্রধান শক্তি হিসেবে শান্তি, সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংহতি রক্ষার বিশেষ দায়িত্ব ভারত ও চীনের কাঁধে। একে অপরের মৌলিক স্বার্থকে সম্মান জানিয়ে যদি দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার পথেই এগোয়, তাহলে কেবল নিজেদের নয়, বৈশ্বিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সভ্যতা ও সুশাসনেও ইতিবাচক অবদান রাখা সম্ভব হবে। আর সেই পথ ধরেই বর্তমান শতাব্দীকে সত্যিকার অর্থে একটি সফল ‘এশীয় শতাব্দী’তে রূপ দেওয়া যেতে পারে।
সানা/আপ্র/৩০/৬/২০২৬