গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

মেনু

খুলনায় নদী খননের মাটিতে চাপা আশ্রয়ণের শতাধিক ঘরবাড়ি

রহিমা ময়না রোজিনা বেগমরা যাবে কোথায়?

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:০১ পিএম, ১৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ২৩:১৭ এএম ২০২৬
রহিমা ময়না রোজিনা বেগমরা যাবে কোথায়?
ছবি

উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলার বরাতিয়া ও খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পজুড়ে এখন আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প - ছবি সংগৃহীত

একদিন যাদের কোনো ঠিকানা ছিল না, যাদের রাত কাটত কখনো নদীর পাড়ে, কখনো অন্যের বারান্দায় কিংবা খোলা আকাশের নিচে-রাষ্ট্রের আশ্রয়ণ প্রকল্প তাদের জীবনে ফিরিয়ে এনেছিল নতুন স্বপ্ন। দুই কক্ষের ছোট্ট একটি ঘর, মাথার ওপর টিনের ছাউনি, নিজের নামে জমির কাগজ-এ যেন ছিল নতুন জীবনের শুরু। কিন্তু সেই স্বপ্নের ঘরগুলোই আজ চাপা পড়ছে নদী খননের মাটির নিচে। উন্নয়নের নামে চলমান এক বৃহৎ প্রকল্প খুলনার ডুমুরিয়ায় শতাধিক গৃহহীন পরিবারের জীবনে ডেকে এনেছে নতুন অনিশ্চয়তা।
উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলার বরাতিয়া ও খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পজুড়ে এখন আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা আর দীর্ঘশ্বাসের গল্প। বুড়িভদ্রা ও আপার ভদ্রা নদী পুনঃখননের সময় নদী থেকে তোলা বিপুল পরিমাণ মাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন এলাকায় স্তূপ করে রাখায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বহু ঘর। কোথাও দেয়াল ফেটে গেছে, কোথাও জানালা ভেঙে ঘরের ভেতর ঢুকেছে কাদা। আবার কোথাও মাটির বিশাল স্তূপ ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ধসের ঝুঁকি। অনেক পরিবার বাধ্য হয়েছে ঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে -ছবি সংগৃহীত

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নদী খননকাজ শুরুর পর চুকনগর অংশে নির্মিত ১৪৫টি ঘরের মধ্যে ১৪৩টি ঘর উচ্ছেদ করা হয়েছে। বর্তমানে অক্ষত রয়েছে মাত্র দুটি ঘর। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অধিকাংশ এখন চুকনগর বাজারসংলগ্ন গরুর হাটের খোলা মাঠে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো টিন, পলিথিন ও কাপড় দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ঝুপড়িতে গাদাগাদি করে বসবাস করছে পরিবারগুলো। প্রচণ্ড রোদ, বৃষ্টি, কাদা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর অনিশ্চয়তা তাদের প্রতিদিনের সঙ্গী। নেই পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থা, নেই নিরাপত্তা, নেই স্বাভাবিক জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগ।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, কয়েক মাস ধরে প্রায় এক হাজার মানুষ খোলা মাঠে দিন কাটাচ্ছেন। যাদের জন্য সরকার স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিল, তারাই আজ আবার আশ্রয়হীন।

চুকনগরের উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর অনেকেই বলেন, নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে জীবনের শেষ সম্বল হিসেবে পেয়েছিলেন এই ঘর। এখন সেই ঘর হারিয়ে তারা আবারো অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি।

এদিকে কাঁঠালতলার বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নদী খননের মাটি ঘরের গা ঘেঁষে স্তূপ করে রাখায় অন্তত ১০টি ঘর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও দেয়ালে ফাটল ধরেছে, কোথাও মেঝে বসে গেছে। বর্ষার বৃষ্টিতে মাটির স্তূপ ধসে পড়ার আশঙ্কা আরো বেড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল মাটির স্তূপ থেকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে কাদা গড়িয়ে ঘরের ওপর পড়ছে। অনেক ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে গেছে। কাদামাটি ঢুকে পড়েছে বসতঘরের ভেতরে। কয়েকটি পরিবারের সদস্যরা খাট, আলমারি, হাঁড়ি-পাতিলসহ প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র বাইরে এনে রেখেছেন।

কাঁঠালতলার বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী রহিমা বেগমের কণ্ঠে ছিল অসহায় আর্তি। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, “নদী ভাঙনে সব হারায়ে এইহানে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইছিলাম। সরকার ঘর দিছিল। এহন নদীর কাঁদা-মাটি এনে আমাদের ঘরের ওপর ফেলছে। ঘরের দেয়াল চড়চড় করে ফাটতেছে। রাইতে ঘুমাইতে পারি না। মনে হয় এই বুঝি মাটি চাপা পড়ে মরে গেলাম।”

প্রকল্পের আরেক বাসিন্দা ময়না বেগম বলেন, “ঘরের ভেতর ফাটল ধরছে। দরজার অংশ ভেঙে গেছে। রান্নাঘরও ক্ষতিগ্রস্ত। শিশুদের নিয়ে নিরাপদে থাকতি পারতেছি না। ঘরের জিনিসপত্রও সরাইতে হইছে।”

স্থানীয় বাসিন্দা রোজিনা বেগম জানান, নদী খননের মাটি পাহাড়ের মতো উঁচু করে রাখা হয়েছে। এতে চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক দিন আগে বৃষ্টির সময় মাটি ধসে তিন বছরের এক শিশু চাপা পড়লেও স্থানীয়দের দ্রুত তৎপরতায় সে প্রাণে বেঁচে যায়।

খর্নিয়া এলাকার দিনমজুর আব্দুল জলিল বলেন, “নদী কাটার সময় ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত গর্ত করা হইছে। একটু বৃষ্টি হইলেই ঘর নদীতে ধইসা যাইব। আমরা গরিব মানুষ, যামু কই?”

বাসিন্দারা জানান, নদী খননের কারণে বহু টয়লেট ভেঙে গেছে। কাঁঠালতলা প্রকল্পে তিনটি টিউবওয়েলের মধ্যে দুটি নষ্ট হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ২৫ থেকে ৩০টি পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে আছে একটি টিউবওয়েল।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় ২০২১ সালে তিন ধাপে চুকনগর, খর্নিয়া ও কাঁঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। দুই কক্ষবিশিষ্ট আধাপাকা ঘরের পাশাপাশি জমির মালিকানাও দেওয়া হয়েছিল তাদের। দীর্ঘদিনের ঠিকানাহীন জীবনের অবসান ঘটিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখেছিল পরিবারগুলো।

অন্যদিকে যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে সরকার হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর মোট ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প পরিচালনা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, যশোর ও খুলনার ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে এই প্রকল্প সরাসরি সম্পৃক্ত। নদীতে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ভবদহ অঞ্চলে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে অনেক এলাকায় বোরো চাষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বৃহত্তর জনস্বার্থে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, জনস্বার্থের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে কেন আরেকটি মানবিক বিপর্যয় তৈরি হলো?

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ ব্যানার্জী বলেন, নদী খননের ৫৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ হবে। খননের মাটি রাখার কারণে মানুষের চলাচলে সমস্যা হয়েছে এবং কিছু ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো মেরামত করে দেওয়া হবে।

তিনি আরো জানান, প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য কোনো আলাদা অর্থ বরাদ্দ নেই।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, বরাতিয়া ও খর্নিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। মাটি অপসারণ ও ঘর মেরামতের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। চুকনগর থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

একদিকে ভবদহ অঞ্চলের লাখো মানুষের জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রয়োজন, অন্যদিকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। উন্নয়নের এই দ্বৈত বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন তুলছেন ক্ষতিগ্রস্তরা-যে ঘর রাষ্ট্র একদিন উপহার দিয়েছিল, সেই ঘর রক্ষার দায় কি রাষ্ট্রের নয়?

খোলা মাঠে, ভাঙা ঘরে কিংবা মাটির স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে তারা এখনো অপেক্ষা করছেন। অপেক্ষা একটি নিরাপদ আশ্রয়ের, একটি নিশ্চিন্ত রাতের, আর সেই স্বপ্নের, যা একদিন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের চাবি হাতে পাওয়ার সঙ্গে জন্ম নিয়েছিল। [সৌজন্য: কিছু তথ্য ও ছবি সহযোগিতায় অনন্য হক।]
সানা/আপ্র/১৭/৬/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

বিনিয়োগ বৃদ্ধির আভাসে সর্বোচ্চ আমদানি
১৬ জুন ২০২৬

বিনিয়োগ বৃদ্ধির আভাসে সর্বোচ্চ আমদানি

গত এপ্রিল মাসে দেশের পণ্য আমদানি তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা ওই...

১২৮ বছর বয়সে আদালত চত্বরে ডাব বিক্রি করেন তিনি
১৫ জুন ২০২৬

১২৮ বছর বয়সে আদালত চত্বরে ডাব বিক্রি করেন তিনি

অন্য কোথাও না, যেখানে প্রতিনিয়ত আইন আর অধিকারের দাবি উত্থাপন ও নিষ্পত্তি হয়-খোদ সেই পাইকগাছা আদালতের...

বিশ্বজুড়ে সোনার দাম কমছে কেন
১৫ জুন ২০২৬

বিশ্বজুড়ে সোনার দাম কমছে কেন

বিশ্বজুড়ে সোনার দাম সাধারণত যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অর্থনৈতিক সংকটের সময় বাড়ে। কারণ বিনিয়োগকারীর...

ডেঙ্গু মৌসুম আসন্ন, বাড়ছে আতঙ্ক
১৫ জুন ২০২৬

ডেঙ্গু মৌসুম আসন্ন, বাড়ছে আতঙ্ক

বিশেষ প্রতিনিধি: দেশে বর্ষাকাল শুরু হতে না হতেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ড...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই