বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একের পর এক মহাসড়ক, উড়ালসড়ক, সেতু, টানেল কিংবা নগর অবকাঠামোর চিত্র। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন খুব কমই উচ্চারিত হয়-স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে আমরা কি সত্যিই এমন একটি যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছি, যা দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে সমানভাবে উন্নয়নের স্রোতের সঙ্গে যুক্ত করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের রেলপথের ইতিহাসের দিকে তাকাতেই হয়। আর সেই ইতিহাস একই সঙ্গে সম্ভাবনার, আবার অবহেলারও।
সম্প্রতি আরো দশটি জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার সরকারি পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক সংবাদ। শেরপুর, মেহেরপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও লক্ষ্মীপুরকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের উন্নয়ন মানচিত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে আসে-স্বাধীনতার চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন বছর পর এসে কেন এই জেলাগুলো এখনও রেলবঞ্চিত?
বিশ্বের প্রায় সব সফল অর্থনীতির দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়-তারা উন্নয়নের শুরুতেই রেলকে জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেছে। শিল্পবিপ্লবের ইউরোপ, আধুনিক আমেরিকা, জাপানের অর্থনৈতিক পুনরুত্থান, চীনের বিস্ময়কর উত্থান কিংবা ভারতের সাম্প্রতিক অবকাঠামোগত রূপান্তর-সব ক্ষেত্রেই রেল ছিল কেন্দ্রীয় শক্তি। কারণ রেল কেবল যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি পণ্য পরিবহন, শিল্পায়ন, আঞ্চলিক সংযোগ, পর্যটন, কৃষি বিপণন এবং জাতীয় সংহতির ভিত্তি।
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে রেলকে সেই দৃষ্টিতে দেখা হয়নি। পাকিস্তান আমলে যে রেল নেটওয়ার্ক ছিল, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তার উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে রেলপথ সংকুচিত হয়েছে, স্টেশন বন্ধ হয়েছে, লোকবল কমেছে, লোকসানে ডুবেছে এবং বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে সড়ক খাতে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে একটি সড়কনির্ভর উন্নয়ন দর্শন রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে স্থান করে নিয়েছে।
কেন এমনটি ঘটেছে? এর উত্তর কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবতাও। দীর্ঘদিন ধরে দেশের পরিবহন অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল সড়কভিত্তিক ব্যবসা। বাস, ট্রাক, পণ্য পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রভাব ছিল প্রবল। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেক সময় তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে-এমন আলোচনা বহু বছর ধরেই জনপরিসরে রয়েছে। ফলে রেলকে জাতীয় স্বার্থের কৌশলগত খাত হিসেবে নয়, অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগী খাত হিসেবেই দেখা হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, রেলের উন্নয়ন কখনোই সড়কের ক্ষতি নয়। বরং একটি আধুনিক রাষ্ট্রে সড়ক, রেল, নৌ ও আকাশপথ-সবই পরস্পরের পরিপূরক। যে দেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রায় পুরো চাপ সড়কের ওপর পড়ে, সেখানে যানজট, দুর্ঘটনা, জ্বালানি অপচয় এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী। সবচেয়ে বড় সমস্যা-সময়ের ব্যাপক অপচয়।
আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি পাঁচশো বিলিয়ন ডলারের মাইল ফলকে। শিল্পায়ন, রপ্তানি, কৃষি উৎপাদন এবং অভ্যন্তরীণ বাজার-সবকিছুই সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু সেই অর্থনীতির উপযোগী যোগাযোগব্যবস্থা কি আমরা গড়ে তুলতে পেরেছি? উত্তরটি খুব আশাব্যঞ্জক নয়।
ভাবা যাক সুন্দরবনের কথা। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য। অথচ স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পরও সুন্দরবনের নিকটবর্তী অঞ্চলে আধুনিক রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা হয়ে সুন্দরবনকেন্দ্রিক একটি পর্যটন রেল করিডর কি এতদিনে নির্মিত হতে পারতো না? নিশ্চয়ই পারতো। কিন্তু প্রয়োজন ছিল দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির।
একইভাবে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণের কাজ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাস্তবায়নের পথে এসেছে। যদি এই নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আধুনিক রেল সংযোগ গড়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের চেহারাই বদলে যেতে পারে। বিশ্বের বহু দেশে পর্যটন অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হচ্ছে রেল। কারণ রেল নিরাপদ, আরামদায়ক, সাশ্রয়ী এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য।
রেলের আরেকটি বড় শক্তি হলো পণ্য পরিবহন। একটি মালবাহী ট্রেন কয়েক ডজন ট্রাকের সমপরিমাণ পণ্য পরিবহন করতে পারে। এর ফলে সড়কের ক্ষয়ক্ষতি কমে, জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পায়, পরিবহন ব্যয় কমে এবং পরিবেশ দূষণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তবে শুধু নতুন রেললাইন নির্মাণ করলেই হবে না। প্রয়োজন একটি সর্বাঙ্গীণ জাতীয় রেলনীতি। সেই নীতি অনুযায়ী আগামী দশ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। নতুন রেলপথের পাশাপাশি দ্বৈত লাইন, বৈদ্যুতিক রেলব্যবস্থা, আধুনিক সংকেত প্রযুক্তি, দ্রুতগতির আন্তঃনগর সেবা, উপনগর রেল এবং মালবাহী করিডর নির্মাণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলতে হবে। সীমান্তবন্দরগুলোর সঙ্গে সরাসরি রেল সংযোগ বাড়াতে হবে। শিল্পাঞ্চল, সমুদ্রবন্দর এবং কৃষিপ্রধান অঞ্চলকে রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্ত করতে হবে। দেশের প্রতিটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রেলকে স্থান দিতে হবে।
রাষ্ট্র চাইলে একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু বাস্তবসম্মত লক্ষ্যও নির্ধারণ করতে পারে-প্রতিদিন গড়ে অন্তত এক কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন। এটি কেবল অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্য নয়; এটি উন্নয়ন দর্শনের পরিবর্তনের প্রতীক। কারণ যে রাষ্ট্র রেলে বিনিয়োগ করে, সে মূলত ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করে।
এই সরকারের নতুন দশ জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার ঘোষণা নিঃসন্দেহে স্বাগতযোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ আর শুধু ঘোষণা শুনতে চায় না; তারা বাস্তবায়ন দেখতে চায়। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বহু সম্ভাবনাময় প্রকল্প কাগজেই আটকে থেকেছে। সেই পুরোনো চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারিত হবে সংযোগের শক্তি দিয়ে। আর সেই সংযোগের সবচেয়ে টেকসই, সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং জনকল্যাণমুখী ভিত্তি হচ্ছে রেলপথ। কাজেই সময় এসেছে রেলকে পরিবহন খাতের একটি অংশ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করার। কারণ রেলের পুনর্জাগরণ মানে শুধু নতুন ট্রেন নয়; এর অর্থ একটি অধিক সংযুক্ত, অধিক উৎপাদনশীল, অধিক ভারসাম্যপূর্ণ এবং অধিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণ।
সানা/আপ্র/১৮/৬/২০২৬