মহাবিশ্বে গ্রহ সাধারণত যে নিয়মে তারাকে প্রদক্ষিণ করে, তার ব্যতিক্রম ঘটিয়েছে দূরবর্তী এক ভিনগ্রহ। ‘জিজে ৩০৯০ বি’ নামের গ্রহটি তার নিজের নক্ষত্রের ঘূর্ণনের বিপরীত দিকে প্রদক্ষিণ করছে। ৭৩ আলোকবর্ষ দূরের এই গ্রহের এমন অস্বাভাবিক কক্ষপথের কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস’-এ।
জিজে ৩০৯০ বি পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ২ গুণ বড় এবং ভরে প্রায় ৪ দশমিক ৫ গুণ ভারী। এ কারণে এটি ‘সাব-নেপচুন’ শ্রেণির গ্রহ। গবেষণায় গ্রহটির কক্ষপথের সঙ্গে তারার ঘূর্ণন অক্ষের মধ্যকার কোণ প্রায় ১৩৬ ডিগ্রি পাওয়া গেছে। এর অর্থ, গ্রহটি শুধু তারার বিষুবীয় তলের তুলনায় ব্যাপকভাবে হেলে নেই, বরং তারার ঘূর্ণনের বিপরীত দিকেও চলছে।
সাধারণত নবজাতক তারাকে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধূলিকণার চাকতি থেকেই গ্রহের জন্ম হয়। সেই চাকতি যে দিকে ঘোরে, সেখান থেকে তৈরি গ্রহগুলোরও সাধারণত একই দিকে এবং প্রায় একই সমতলে তারাকে প্রদক্ষিণ করার কথা। এ কারণে জিজে ৩০৯০ বি-এর বিপরীতমুখী কক্ষপথ বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার প্রধান লেখক জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়ান কার্তেরে বলেন, গ্রহটি শুধু অত্যন্ত অসমতল কক্ষপথে নেই, বরং তারার ঘূর্ণনের বিপরীত দিকেও প্রদক্ষিণ করছে - যা গবেষকদের বিস্মিত করেছে।
গ্রহটির কক্ষপথের এই অস্বাভাবিকতা পরিমাপ করতে চিলির লা সিলা মানমন্দিরে স্থাপিত এনআইআরপিএস নামের অবলোহিত বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর সাহায্যে গবেষকেরা গ্রহটির ভর ও কক্ষপথের বিন্যাস নির্ণয় করেন।
এ ধরনের বিপরীতমুখী কক্ষপথ তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণত কোনো বড় গ্রহ বা অন্য কোনো নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় প্রভাবকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু জিজে ৩০৯০ ব্যবস্থায় এমন কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তুর অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা গ্রহটির কক্ষপথকে এভাবে ঘুরিয়ে দিতে পারে।
এ কারণে গবেষকেরা ভিন্ন একটি সম্ভাবনা সামনে এনেছেন। তাদের ধারণা, জিজে ৩০৯০ নক্ষত্রটি অতীতে এমন একটি দ্বিতীয় গ্যাস-ধূলির চাকতি নিজের মধ্যে টেনে নিয়েছিল, যা মূল নক্ষত্রের ঘূর্ণনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং বিপরীত দিকে ঘুরছিল। পরে ওই চাকতি থেকেই গ্রহগুলোর সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি এখনো একটি বৈজ্ঞানিক অনুমান, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ব্যাখ্যা নয়।
গবেষণা অনুযায়ী, ৭০ ডিগ্রির বেশি কক্ষপথ-বিচ্যুতি থাকা বহুগ্রহবিশিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে জিজে ৩০৯০ অন্যতম। তবে অন্য পরিচিত ব্যবস্থাগুলোর তুলনায় এর বিশেষত্ব হলো - এখানে এমন কোনো বিশাল সহচর নক্ষত্র বা গ্রহের প্রমাণ নেই, যার মহাকর্ষীয় টানে এই অস্বাভাবিক কক্ষপথ তৈরি হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার গ্রহ কীভাবে জন্ম নেয় এবং সময়ের সঙ্গে তাদের কক্ষপথ কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সে সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা যাচাইয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
সানা/আপ্র/২৫/৯/২০২৬