মাহাবুব রহমান বিপ্লব
তখন নবম কিংবা দশম শ্রেণীতে পড়ি। চারপাশের নিসর্গ, গ্রামীণ ধূলিমাখা পথঘাট আর বইয়ের পাতার বড় কবি-লেখকদের ছবি দেখে অবুঝ মনেও স্বপ্ন জাগতো—একদিন আমারও একটি নিজস্ব কবিতার বই বের হবে। রাতের পর রাত জেগে ডায়েরির পাতায় কলম চালাতাম। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল নির্মম বাস্তবতা ও অভাব।
বদরগঞ্জের স্থানীয় তছলিম প্রিন্টিং প্রেস, হাসান প্রিন্টিং প্রেস আর বকশী প্রেসে ঘুরে জেনেছিলাম, মাত্র ১০টি কবিতা ছাপাতে সে সময় দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ লাগবে। আজকের দিনে সামান্য মনে হলেও, ছাত্রজীবনে ওটা ছিল পাহাড়সম এক অঙ্ক। কোনো রোজগার ছিল না। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জুতোর সুকতলা ক্ষয় করেছি, কিন্তু কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি।
হতাশার চরম মুহূর্তে এক পাগলামির কথা মাথায় এল। মনে হলো, নিজের একটি কিডনি বিক্রি করে হলেও বই প্রকাশ করব! এই গোপন ইচ্ছার কথা যখন আপন মামা ও ক্লাসবন্ধু নোয়াজেসের সাথে শেয়ার করলাম, সে ক্ষিপ্ত হয়ে বাধা দিল। ধমক দিয়ে বলল, কিডনি বিক্রি করতে হবে না, আমি তোকে দিবোই না! নোয়াজেসের সেই সান্ত্বনা আর বুকে জড়িয়ে ধরা তখনকার মতো চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দিন যায়, বই আর বের হয় না। অর্থাভাবে স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমতে থাকে, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটে টেনশনে। একদিন চরম অভিমানে আর ক্ষোভে জীবনের সব কবিতা সংগ্রহ করে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম, কপাল পোড়া মানুষের কবি হওয়া বুঝি আর হলো না।
পড়াশোনার পাট চুকিয়ে পা রাখলাম বৈবাহিক জীবনে। সংসারের জোয়াল কাঁধে তুলে নিলাম। দিন বদলেছে; জমাজমি, টাকা-পয়সা, সংসার- সব মিলিয়ে জীবনের চাকা সচল হলো। মনের কোণে জমে থাকা ধুলো সরিয়ে আবার শুরু করলাম কবিতা ও গল্পের খাতা নিয়ে বসা। কিন্তু সাংসারিক নানা ব্যস্ততা ও যান্ত্রিক চাপে সে লেখাও একসময় থমকে গেল।
ভাবিনি জীবন এত সুন্দর মোড় নেবে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পরিচয় হলো একটি স্বনামধন্য প্রকাশনীর সাথে। তাদের কাছে আমার না পাওয়ার গল্পটা খুলে বললাম- এক সময় শত কবিতা লিখেও অর্থাভাবে ছাপাতে পারিনি, তাই লেখালেখি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তারা সহানুভূতির সাথে বললেন, আগের কথা ভুলে যান। আবার লেখা শুরু করুন, আমাদের কাছে পাঠান। আপনার লেখা যদি উপযোগী হয়, আমাদের প্রকাশনী থেকেই আপনার একক কবিতার বই বের করা হবে।
যেন মৃত সঞ্জীবনী সুধা পেলাম! কদিনেই নতুন উদ্যমে গুছিয়ে ফেললাম আমার কবিতা ও গল্পগুলো। প্রকাশনীতে জমা দেওয়ার পর তারা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করলেন এবং জানালেন, হ্যাঁ, কাজ হবে!
অবশেষে সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই সপ্তাহেই ইনশাআল্লাহ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে আমার প্রথম একক কবিতা ও গল্পের বই- ‘কাগজের চিরকুট’।
আজ আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করছি। জীবনের প্রথম সেই শৈশবের স্বপ্ন শেষ বয়সে এসে মহান মালিক এমন চমৎকারভাবে পূরণ করবেন, তা কখনো কল্পনাও করিনি। আল্লাহর অশেষ দয়ায় নিজের কোনো অঙ্গ বা কিডনি বিক্রি করতে হয়নি, বরং বিনা খরচেই আমার দীর্ঘদিনের সাধের বইটি প্রকাশিত হতে চলেছে।
বদরগঞ্জের সেই ছোট্ট গ্রামের প্রেসের সামনে থেকে শুরু হওয়া আমার এই দীর্ঘ লড়াইয়ের ফসল ‘কাগজের চিরকুট’ বইটি আপনাদের সংগ্রহ করে পড়ার জন্য বিনীত আহ্বান জানাচ্ছি। বইটি পড়ে আপনাদের ভালো লাগলে এবং একটুও ছুঁয়ে যেতে পারলে আমার এই দীর্ঘ কবিজীবনের সংগ্রাম সার্থক হবে বলে মনে করব।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬