কবিতা লিখছেন, অনুবাদ করছেন, প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করছেন আবার কখনো প্রবন্ধ লিখছেন, কখনো মঞ্চে পারফর্ম করছেন কখনো ভিজ্যুয়াল আর্ট নিয়ে কাজ করছেন। অ্যান কারসনকে ঠিক কোন পরিচয়ে চেনা যায়, সেটিই যেন একটা ধাঁধা! তার লেখায় তথ্য আছে আবার কল্পনাও আছে; আছে ইতিহাস, আছে কবিতা, ব্যক্তিগত অনুভূতি। সব মিলিয়ে তার বই যেন একই সঙ্গে সাহিত্য ও শিল্পের সমাবেশ। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য তার লেখার বড় একটি অংশজুড়ে আছে। তবে পুরোনো লেখকদের তিনি জীবনকে জানার চেষ্টা করেন। স্যাফো, সিমোনিদিস, সফোক্লিস কিংবা ইউরিপিদিসসহ হাজারো বছর আগের এসব লেখকের কথা আজকের মানুষের জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। এ বিষয় নিয়েই এবারের সাহিত্য পাতার প্রধান রচনা
চার দশকের বেশি সময় ধরে সাহিত্যের চেনা ছক ভেঙে নিজের মতো করে লিখে চলেছেন এই কানাডীয় লেখক । ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারও উঠেছে তার হাতে।
কারসনের বিশেষত্ব কেবল তার লেখার ধরনে নয়। তার লেখা পড়লে মনে হয়, চিন্তা করাটাও একটা সাহিত্যিক কাজ হতে পারে। গবেষণা আর সৃজনশীল লেখা যে আলাদা দুটো জগৎ নয়; বরং পাশাপাশি হাঁটতে পারে, সেটিই তিনি বারবার দেখিয়েছেন। প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, শোক, একাকিত্ব, বিচ্ছেদ কিংবা মৃত্যু, মানুষের এসব অনুভূতি তো আর পুরোনো হয় না। তাই প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের শব্দও তার লেখায় নতুন করে কথা বলেছে। তার কাছে প্রাচীন সাহিত্য কোনো জাদুঘরে তুলে রাখা পুরোনো জিনিস নয়। বরং এমন এক জগৎ, যেখান থেকে আজও নতুন নতুন অর্থ বের করা যায়।
কারসনের লেখায় একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে, দূরত্ব। দুজন মানুষের মধ্যে দূরত্ব, এক ভাষা থেকে আরেক ভাষার দূরত্ব, জীবিত ও মৃতের দূরত্ব, কিংবা যা জানা যায়, আর যা কখনোই পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়, এসব নিয়েই তিনি ভাবেন। তার কাছে ভালোবাসা মানেই কাউকে পাওয়া নয়। বরং কখনো কখনো না-পাওয়াটাও ভালোবাসার বড় অংশ। মানুষের জীবনের যে শূন্যতাগুলো থাকে, আমরা সাধারণত সেগুলোকে এড়িয়ে যাই, কারসন সেখানেই কলম ধরেছেন। এ কারণেই তার লেখায় না পাওয়া, নীরবতা ও শূন্যতার এত গুরুত্ব।
কারসনের লেখার ধরনও বেশ মজার। কোথাও কবিতা, কোথাও প্রবন্ধ, কোথাও অনুবাদ, কোথাও উদ্ধৃতি; আবার হঠাৎ এমন কিছু, যা প্রচলিত বইয়ের ছকের সঙ্গে একেবারেই মেলে না। খণ্ডিত লেখা, কোলাজ, হঠাৎ থেমে যাওয়া; এসব তার কাছে নিছক স্টাইল নয়। এগুলোর মাধ্যমে তিনি স্মৃতি, ভালোবাসা, হারানো কিংবা আকাঙ্ক্ষার মতো জটিল বিষয়কে তুলে ধরতে চান। ইরোস দ্য বিটারসুইট (১৯৮৬), অটোবায়োগ্রাফি অব রেড (১৯৯৮), দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড (২০০১), নক্স (২০১০) ও ফ্লোট (২০১৬); এসব বইয়ে তিনি বারবার দেখিয়েছেন, কবিতা বা বই দেখতে ঠিক কেমন হতে হবে, তার কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। তার কাছে লেখার ধরন কেবল সাজসজ্জা নয়। কী বলা হচ্ছে, আর কীভাবে বলা হচ্ছে, দুটোই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
কারসনের লেখায় একদিকে আছে বুদ্ধিবৃত্তিক দোলাচাল, অন্যদিকে আছে আবেগের গভীরতা। তিনি কঠিন বিষয় নিয়ে লেখেন, কিন্তু কেবল জ্ঞান বিতরণের জন্য নয়। বরং পাঠককে ভাবানোর জন্য, ভাবনার জগতে নেওয়ার জন্য। তার লেখা কখনো মজার, কখনো বিষণ্ন, কখনো একটু আবেগে ভাসানো। তরুণ লেখক ও গবেষকদের ওপরও তার প্রভাব পড়েছে। অনেকেই এখন সাহিত্য সমালোচনা, অনুবাদ, কবিতা ও সৃজনশীল লেখার সীমানা আলাদা করে দেখছেন না। তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটিই, সাহিত্যে সব প্রশ্নের উত্তর থাকতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। বরং কখনো কখনো ভালো সাহিত্য এমন প্রশ্নই তৈরি করে, যার উত্তর খুঁজতে পাঠককে বই বন্ধ করার পরও ভাবতে হয়।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এমন লেখকদেরই স্বীকৃতি দেয়- যারা সাহিত্যের সম্ভাবনাকে একটু হলেও বড় করে দেন। অ্যান কারসন ওই কাজটি করেছেন নিজের মতো করে। কবিতা ও গবেষণা, প্রাচীন ও আধুনিক সময়, চিন্তা ও অনুভূতি, সবকিছুর মাঝখানে তিনি তৈরি করেছেন নিজের এক অদ্ভুত সাহিত্য ভুবন। সেখানে ভাষা কেবল লেখার মাধ্যম নয়; ভাষা নিজেই হয়ে ওঠে ভাবনার খোরাক।
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬