বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আবারো হারালো এমন এক মানুষকে, যাঁর কর্মজীবন শুধু একটি সংবাদমাধ্যমের সাফল্যের ইতিহাস নয়, দেশের সংবাদচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের দলিল। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আকস্মিক প্রয়াণে তাই শোকের ভার শুধু তাঁর পরিবার, সহকর্মী কিংবা সাংবাদিক সমাজের ওপর নয়; এ শোক বাংলাদেশের গণমাধ্যমেরও। মাত্র ৫৯ বছর বয়সে লন্ডনের হাসপাতালে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু আমাদের জন্য গভীর বেদনার। রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে মন্ত্রী, রাজনীতিক, সাংবাদিক সংগঠন ও বিভিন্ন পেশাজীবী মহলের শোকবার্তাই প্রমাণ করে, তাঁর কর্মের পরিধি কত বিস্তৃত ছিল।
তাঁর সাংবাদিকতা শুরু হয়েছিল গত শতকের শেষভাগে। সংবাদপত্রের পর যুক্তরাজ্যের বিবিসিতে উপস্থাপক, প্রযোজক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদচর্চার মানদণ্ডের সঙ্গে পরিচিত করে। ব্যবসা, রাজনীতি, অর্থনীতি, উন্নয়ন, কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত দৃষ্টিকে বহুমাত্রিক করেছে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান সম্ভবত সংবাদমাধ্যমের প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে সময়ের অনেক আগেই অনুধাবন করা।
২০০৬ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের যাত্রায় নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাংলাদেশের সংবাদ পরিবেশনের প্রচলিত সীমা ভেঙে দেন। সার্বক্ষণিক অনলাইন সংবাদ, মুঠোফোনভিত্তিক সংবাদসেবা এবং ক্ষুদেবার্তার মাধ্যমে দ্রুত সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ তখনকার বাস্তবতায় ছিল দূরদর্শী পদক্ষেপ। আজ যখন সংবাদ পাঠকের হাতে, পর্দায় এবং মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায়, তখন মনে রাখা প্রয়োজন-এই পরিবর্তনের ভিত গড়ে তুলতে যাঁরা সাহস করেছিলেন, তৌফিক ইমরোজ খালিদী তাঁদের অন্যতম। দেশের মধ্যে তাঁকেই পথিকৃৎ বলতে হবে।
তাঁর গুরুত্ব শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সংবাদকে পণ্য নয়, জনস্বার্থের দায়িত্ব হিসেবে দেখার যে চর্চা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটিও আজ বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তাঁর সম্পাদনাগত দর্শনে খবরের মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা ছিল তথ্যের সত্যতা, জনজীবনে তার প্রভাব এবং ক্ষমতার কাছে প্রশ্ন তোলার সক্ষমতায়। সংবাদকে সংবাদ হিসেবেই রাখার, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিকে সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার যে অবস্থান তিনি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন, সেটিই তাঁর পেশাগত উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন মহলের সাম্প্রতিক শোকবার্তায় তাঁর সততা, সাহস, পেশাদারত্ব, স্বচ্ছতা ও চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার যে প্রশংসা এসেছে, তা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনকে ঘিরে জনমনে তৈরি হওয়া আস্থারই প্রতিফলন। ২০১৭ সালে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পুরস্কারে বিশেষ সম্মাননাও তাঁর এই অবদানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যু আমাদের সামনে তাই একটি বড় প্রশ্নও রেখে গেল। ডিজিটাল সাংবাদিকতার বিস্তার হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে গুজব, বিভ্রান্তি, পক্ষপাত, কৃত্রিম উত্তেজনা ও দ্রুততার নামে যাচাইহীন সংবাদও বেড়েছে। এই বাস্তবতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর উত্তরাধিকারকে কেবল স্মৃতিচারণে আটকে রাখা চলবে না। সংবাদমাধ্যমকে আরো স্বাধীন, তথ্যনির্ভর, প্রযুক্তিসচেতন, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য তাঁর কর্মদর্শন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। রাষ্ট্রকেও নিশ্চিত করতে হবে এমন পরিবেশ, যেখানে সত্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিককে ভয় বা চাপের কাছে নত হতে না হয়। একই সঙ্গে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব স্বাধীন সম্পাদকীয় নীতি, দক্ষ জনবল, যাচাইপ্রক্রিয়া ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কারণ একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম কেবল সাংবাদিকের কর্মক্ষেত্র নয়; এটি নাগরিকের জানার অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক সমাজের নিরাপত্তাবলয়ের অন্যতম স্তম্ভ।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী ছিলেন এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যাঁরা বাংলাদেশের সংবাদকে কাগজের পৃষ্ঠা থেকে বৈশ্বিক ডিজিটাল পরিসরে নিয়ে গেছেন। তাঁর বিদায় একটি জীবনের অবসান; কিন্তু তাঁর নির্মিত পথের অবসান নয়। বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে সংবাদযাত্রা তিনি এগিয়ে নিয়েছিলেন, তা আরো দায়িত্বশীল হাতে এগিয়ে যাক-এ হোক তাঁর প্রতি সবচেয়ে গভীর শ্রদ্ধা। মানুষ চলে যান, সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার আদর্শ থেকে যায়; আর সেই আদর্শই একদিন তাঁর নামকে স্মৃতির চেয়ে বড় করে তুলবে।
সানা/আপ্র/৪/১০/২০২৬