ভালো শিশু হলে বড়দের কথা শুনতে হয়’, ‘মা-বাবার কথা অমান্য করবে না’, ‘কেউ কিছু বললে চুপচাপ মানবে’-ছোট থেকেই এমন কথা শুনতে শুনতেই বড় হয় অনেক শিশু। ভদ্রতা, শৃঙ্খলা আর বড়দের সম্মান করা অবশ্যই জরুরি। কিন্তু একটি জায়গায় গিয়ে এই শিক্ষা উল্টা সমস্যার কারণ হতে পারে।
কারণ শিশুকে যদি সব পরিস্থিতিতেই বাধ্য, চুপচাপ এবং প্রশ্নহীনভাবে অন্যের কথা মেনে চলতে শেখানো হয়, তাহলে সে কখন ‘না’ বলতে হবে, কখন সরে আসতে হবে এবং কখন সাহায্য চাইতে হবে-সেটা বুঝতে সমস্যায় পড়তে পারে। বিশেষ করে অপরিচিত মানুষের আচরণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুকে ভালো মানুষ হতে শেখানো আর সবাইকে খুশি রাখতে শেখানো এক বিষয় নয়। একটি শিশু ভদ্র হবে, অন্যকে সম্মান করবে, কিন্তু তার নিজেরও মতামত থাকতে পারে-এই পার্থক্যটি ছোট থেকেই বোঝানো দরকার। কেউ বড় হলেই তার সব কথা মানতে হবে, এমন ধারণা শিশুর মনে গেঁথে দেওয়া ঠিক নয়। বরং তাকে শেখাতে হবে, অস্বস্তিকর কিছু মনে হলে প্রশ্ন করা যায়, সরে আসা যায় এবং প্রয়োজনে জোরে ‘না’ বলা যায়।
অপরিচিত মানুষ সবসময় নিরাপদ নয়
শিশুরা অনেক সময় খুব সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে। কেউ মিষ্টি কথা বলল, পছন্দের খেলনা দেখাল, পরিচিত কারও নাম বলল কিংবা সাহায্যের অজুহাত দিলেই শিশু তার সঙ্গে কথা বলতে পারে।
সমস্যা হলো, অতিরিক্ত বাধ্য হতে শেখানো শিশু হয়তো ভাবতে পারে, বড় কেউ কিছু বললে তা মানতেই হবে। এই জায়গাতেই বিপদের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
তাই শিশুকে শুধু ‘অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলবে না’ বললেই হবে না। বাস্তব পরিস্থিতি বুঝিয়ে শেখাতে হবে- কেউ যদি কোথাও নিয়ে যেতে চায়, একা ডাকতে চায়, শরীর স্পর্শ করতে চায়, গোপন কিছু রাখতে বলে কিংবা ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখতে চায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সরে যেতে হবে এবং বিশ্বস্ত বড় কাউকে জানাতে হবে।
‘না’ বলা খারাপ আচরণ নয়
অনেক শিশুই ‘না’ বলতে সংকোচ বোধ করে। কারণ তাকে বারবার শেখানো হয়, ভদ্র বাচ্চারা কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না।
এই ধারণাটি একটু বদলানো জরুরি। কেউ শিশুকে এমন কিছু করতে বললে, যাতে সে অস্বস্তি বোধ করে, তখন দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলা অসভ্যতা নয়। নিজের নিরাপত্তার জন্য ‘না’ বলা প্রয়োজনীয় দক্ষতা। শিশুকে এমন কয়েকটি বাক্য অনুশীলন করানো যেতে পারে-‘আমি এটা করতে চাই না’, ‘আমাকে একা থাকতে দিন’, ‘আমি এখন মায়ের কাছে যাব’ কিংবা ‘আমি সাহায্য চাই।’
শুধু ভয় দেখিয়ে নয়, আত্মবিশ্বাসও শেখান
অপরিচিত মানুষ সম্পর্কে শিশুকে সবসময় ভয় দেখালে তার মনে অযথা আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। তার বদলে পরিস্থিতি চেনার অভ্যাস তৈরি করা ভালো। শিশুকে বোঝান, কেউ ভালো মানুষ কি না শুধু চেহারা দেখে বোঝা যায় না। আবার পরিচিত হলেই যে সবসময় নিরাপদ, তাও নয়। তাই মানুষের আচরণে অস্বস্তি লাগলে নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বিশ্বস্ত মানুষের তালিকা তৈরি করুন
শিশুর সঙ্গে বসে কয়েকজন ‘বিশ্বস্ত বড় মানুষ’ ঠিক করে দিতে পারেন-যেমন মা-বাবা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, শিক্ষক বা পরিবারের নির্ভরযোগ্য কেউ। তাকে শেখান, কোনো ঘটনায় অস্বস্তি হলে এই মানুষদের কাছে সঙ্গে সঙ্গে বলতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুকে এমন পরিবেশ দেওয়া যেখানে সে কোনো ঘটনা বললে প্রথমেই বকুনি বা ভয় না পায়। সে যদি মনে করে সত্যি কথা বললে শাস্তি হবে, তাহলে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও গোপন করতে পারে।
‘ভালো শিশু’ নয়, সচেতন শিশু
শিশুর ভদ্রতা শেখান, শিষ্টাচার শেখান, অন্যকে সম্মান করতে শেখান। তবে একই সঙ্গে শেখান নিজের সীমারেখা, নিজের শরীর, নিজের অনুভূতি এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়ার অধিকারও।
সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় পরিবার, ঘরেই শুরু হোক নৈতিক শিক্ষার পাঠ
কারণ সত্যিকারের ভালো শিক্ষা শুধু চুপচাপ কথা মেনে নেওয়া নয়। বরং কখন কথা শুনতে হবে, কখন প্রশ্ন করতে হবে, কখন দূরে সরে যেতে হবে এবং কখন দৃঢ়ভাবে ‘না’ বলতে হবে-সেটিও জানা। শিশুকে তাই শুধু ‘ভালো বাচ্চা’ হওয়ার চাপ না দিয়ে সচেতন, আত্মবিশ্বাসী ও নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সতর্ক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই বেশি জরুরি।
সূত্র: হেলথি চিল্ড্রেন, হ্যাপি ফ্যামেলি, মিডিয়াম
এসি/আপ্র/০৪/১০/২০২৬