রাষ্ট্রদ্রোহ, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া ও লেফটেন্যান্ট গুলশান আরাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। গত রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে ঢাকার দুটি এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালত তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সাইফুল ইসলাম এ তথ্য জানান। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।
রিমান্ড আবেদনে অভিযোগ করা হয়, আসামিরা নিজ বাসায় অবস্থান করে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টারস আলফা’ ও ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামে সরকারবিরোধী হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থেকে তহবিল সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছিলেন। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান (অব.) আজিজ আহমেদসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দলটির পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠিত অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়।
আবেদনে আরো বলা হয়, তাঁরা ‘কালআজকাল.কম’ নামে ফেসবুক পেজ খুলে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতায় উসকানিমূলক কনটেন্ট তৈরি এবং প্রচারের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছেন।
কাজী গুলশান আরার বিরুদ্ধে আবেদনে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর নির্বাচনের প্রাক্কালে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি একাত্মতা ও আনুগত্য প্রকাশ করেন। সহযোগী ১০১ জনকে নিয়ে ‘সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটিও গঠন করেন তিনি। তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, সংগঠনটির কাজ দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা।
এর আগে বিকেলে দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। দেবাশীষ বড়ুয়ার পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মনসুর রিপন রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করার মতো কোনো অভিযোগ নেই। দেশকে অস্থিতিশীল করা বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও নেই বলে দাবি করেন তিনি। আইনজীবীর ভাষ্য, আদালতে হাজির করার আগ পর্যন্ত আসামি হেফাজতে থাকায় রিমান্ড আবেদনের উল্লেখিত কারণ পূরণ হয়েছে।
গুলশান আরার পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান রিমান্ড বাতিল ও জামিন চান। তিনি বলেন, তাঁর মক্কেল অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ব্যবসা করছেন। সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কারণে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা অস্বাভাবিক নয় বলে যুক্তি দেন তিনি। তাঁর দাবি, ফেসবুক পেজ খোলা ও কনটেন্ট তৈরি করাই অপরাধ প্রমাণ করে না।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশীদ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, আসামিরা সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য তৎপর। দেশি-বিদেশি গুপ্তচরের সঙ্গে যোগাযোগ ও দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্য তাদের কাছে পাচারের অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করলে রাষ্ট্রদ্রোহের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে রোববার রাতে ঢাকার দুটি এলাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরে ডিবির পল্লবী জোনাল টিমের পরিদর্শক আলী আকবর তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
সানা/আপ্র/১২/১০/২০২৬