অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, এটি একটি বাছাইকৃত প্রক্রিয়া, যেখানে সীমিত পরিসরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কার: সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা, আদালতের নির্দেশনা ও জনআকাঙ্ক্ষা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
সারা হোসেন বলেন, ‘এটা সিলেক্টিভ প্রসেস। কয়েকজনকে নিয়ে আপনারা বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গণতন্ত্র এখানে কোথায় ছিল? কিসের নির্বাচন, কে এসছে? বাইরে থেকে কে কথা বলতে পেরেছে? কেউ না।’ তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, এই প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ কতটা ছিল এবং কীভাবে সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়েছে।
ঐকমত্য কমিশনে নারী প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, কমিশনে একজনও নারী সদস্য ছিলেন না। একইভাবে বিচারব্যবস্থা সংস্কার কমিশনেও কোনো নারী আইনজীবী বা বিচারপতিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা একটি বড় ঘাটতি।
গণভোটের তৃতীয় প্রশ্ন প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, জনগণের একটি বড় অংশ এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা ছাড়াই ভোট দিয়েছেন। উপস্থিতদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, কয়জন ব্যক্তি ৩০টি প্রস্তাব সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘আপনারা কিসের জন্য ভোট দিয়েছেন, সেটা আপনারা জানেন বলে আমার মনে হয় না। হ্যাঁ বা না-এটা জানি, কিন্তু কিসের জন্য ভোট দিচ্ছি, সেটা যদি না জানি, তাহলে ভোটের মূল্য কতটুকু থাকে?’
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ নিয়েও মত দেন সারা হোসেন। অন্তর্বর্তী সময়ে প্রণীত এই দুটি আইন পুনর্বহালের পক্ষে মত প্রকাশ করেন তিনি।
বিচার বিভাগের সাম্প্রতিক ও অতীত পরিস্থিতির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পার হলেও এ বিষয়ে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো দাবি ওঠেনি। তিনি বলেন, ঘটনাটির সুরাহা হওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নির্ধারণ করা জরুরি।
এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকদের পদত্যাগের ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, আন্দোলনের চাপে হঠাৎ করে বিচারকদের অপসারণ বা পুনর্বহাল বিচার বিভাগের স্থিতিশীলতার জন্য প্রশ্ন তৈরি করে। তিনি উল্লেখ করেন, অপসারিতদের মধ্যে কয়েকজন দক্ষ বিচারকও ছিলেন।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায় প্রদানকারী সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে ‘মিথ্যাভাবে’ জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় জড়ানো হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, এত সময় পার হলেও এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। তাঁর প্রশ্ন, যেখানে গুরুতর অভিযোগ আনা হচ্ছে, সেখানে প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি কোথায়?
সারা হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, এসব বিষয়ে নাগরিক সমাজ, সুশীল সমাজ, বার কাউন্সিল বা আইনজীবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তেমন কোনো উচ্চকণ্ঠ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, এই নীরবতা উদ্বেগজনক।
গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, আইনজীবী ইমরান সিদ্দিকী ও ফাহিম মাশরুরসহ আরো অনেকে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
বৈঠকে বক্তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সানা/ডিসি/আপ্র/২১/৪/২০২৬