ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার নিজস্ব নীতিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পেইজ মনিটাইজেশনের জন্য বিবেচিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত ১৯টি ফেসবুক পেইজকে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে। এসব পেইজের অধিকাংশই নিজেদের পরিচয় দিয়েছে সরকারি সংস্থা, পুলিশ স্টেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, সরকারি কর্মকর্তা অথবা সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে।
তথ্য যাচাই ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মনিটাইজেশন নীতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর সংরক্ষিত মনিটাইজেশন আর্কাইভ পর্যালোচনা করে এই তালিকা তৈরি করেছে।
মনিটাইজেশনের আওতায় থাকা পেইজগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, ট্যুরিস্ট পুলিশ বাংলাদেশ, ডিআইজি-রংপুর রেঞ্জ এবং বিভিন্ন জেলা পুলিশ কার্যালয়ের পেইজ রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পেইজ ভেরিফায়েড। অন্তত ১৪টি জেলা পুলিশ কার্যালয়ের পেইজও তালিকায় রয়েছে।
এসব পেইজের লিংক দেশের বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটে দেওয়া রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট পেইজগুলো যে সরকারি প্রতিষ্ঠান বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, সে পরিচয় তাদের নিজেদের শ্রেণি নির্ধারণেও স্পষ্ট।
ডিসমিসল্যাবের তালিকাভুক্ত ১৯টি পেইজের মধ্যে মাত্র দুটি নিজেদের শ্রেণি ‘পাবলিক ফিগার’ ও ‘ডিজিটাল ক্রিয়েটর’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাকি ১৭টি পেইজের পরিচয়ে সরকারি সংস্থা, পুলিশ স্টেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, সরকারি কর্মকর্তা অথবা সশস্ত্র বাহিনীর উল্লেখ রয়েছে।
২০২০ সাল থেকে মনিটাইজেশন
বাংলাদেশের কয়েকটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেইজ অন্তত ২০২০ সাল থেকেই মেটার বিভিন্ন মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২০ সালের ৬ জুন শেরপুর জেলা পুলিশ ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ভেরিফায়েড পেইজ ফেসবুকের ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে আরো ১৭টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেইজ মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় আসে।
বাংলাদেশ পুলিশের মূল ভেরিফায়েড পেইজ প্রথম মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয় ২০২২ সালের মার্চে। কয়েকটি জেলা পুলিশের পেইজ ২০২৩ সালে, বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ বাংলাদেশ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়।
২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট মেটা ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপন, রিলসে বিজ্ঞাপন ও পারফরম্যান্স বোনাস কর্মসূচি বন্ধ করে সেগুলোকে নতুন কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় আনে। নতুন ব্যবস্থায় ভিডিওর পাশাপাশি ছবি ও লেখা প্রকাশ থেকেও আয় করার সুযোগ রাখা হয়।
‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১১টি পেইজ একসঙ্গে নতুন কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। এর পাঁচ দিন পর ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের মূল ভেরিফায়েড পেইজও কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে আরো সাতটি পেইজ সরাসরি নতুন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। সর্বশেষ নড়াইল জেলা পুলিশের পেইজটি চলতি বছরের ২২ আগস্ট এতে যুক্ত হয়েছে।
মেটার নতুন কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচি নিয়ে ডিসমিসল্যাবের এটি ধারাবাহিক অনুসন্ধানের দ্বিতীয় পর্ব। এর আগে জুনে প্রকাশিত প্রথম প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নির্বাচিত প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মনিটাইজেশন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
মেটার আমন্ত্রণেই যুক্ত হওয়ার সুযোগ
মেটার সহায়তা পেইজের তথ্য অনুযায়ী, কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ শুরুতে শুধু আমন্ত্রণের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক, ই-মেইল, মেটা বিজনেস স্যুট ও প্রফেশনাল ড্যাশবোর্ডসহ আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন মাধ্যমে নির্মাতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
যারা আমন্ত্রণ পাননি, তারা কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারেন। তবে আগ্রহ প্রকাশ করলেই আমন্ত্রণ পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
অর্থাৎ অনুসন্ধানে চিহ্নিত ১৯টি বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেইজও মেটার আমন্ত্রণের মাধ্যমেই কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে বলে ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। অথচ মেটার পার্টনার-পাবলিশার নীতিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে মনিটাইজেশনের জন্য বিবেচনা না করার কথা বলা হয়েছে।
আয় হলেও অর্থ তুলতে পারেননি
কুমিল্লা জেলা পুলিশের একটি পেইজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিসমিসল্যাবকে জানান, পেইজ থেকে আয় হলেও তারা সেই অর্থ তুলতে পারেননি। মেটা থেকে অর্থ গ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বা পেমেন্ট গেটওয়ে সক্রিয় করা হয়নি।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পেইজটি থেকে প্রায় ১০ ডলার আয় হয়েছিল। সেই অর্থ এখনো ফেসবুকেই রয়েছে।
বন্ধ হয়েছে, আবার চালুও হয়েছে
বাংলাদেশ পুলিশের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে ২৭ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে। ২০২২ সালের মার্চ থেকে পেইজটি মেটার বিভিন্ন মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় ছিল। তবে বিভিন্ন সময়ে সেটিকে কর্মসূচি থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও পরে আবার যুক্ত করা হয়েছে।
২০২২ সালের ২০ মার্চ পেইজটি প্রথম ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। মাত্র ১০ দিন পর ১ এপ্রিল তা বাদ দেওয়া হয়। পরে আরো চারবার পেইজটি ওই কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং প্রতিবারই অল্প সময়ের মধ্যে বাদ দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই পেইজটি আবার ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপনে যুক্ত হয়। এই সুবিধা ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সক্রিয় ছিল।
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পেইজটি নতুন কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং এরপর থেকে কর্মসূচিটির অংশ রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা পুলিশের পেইজেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল এটি ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপনে যুক্ত হয় এবং ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর বাদ দেওয়া হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই আবার যুক্ত হয়। ২ সেপ্টেম্বর নতুন কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার পর ২০ অক্টোবর আবার সরিয়ে দেওয়া হয়।
পেইজটি পরিচালনাকারী এক পুলিশ কর্মকর্তা দাবি করেন, ২০২২ বা ২০২৩ সালের দিকে মনিটাইজেশন চালু হয়েছিল, পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর আর্কাইভে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৮ নভেম্বর পেইজটি আবার কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে এবং এখনো সক্রিয় রয়েছে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের পেইজ ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট রিলসে বিজ্ঞাপন ও ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরদিন রিলসে বিজ্ঞাপন স্থগিত হলেও ইন-স্ট্রিম বিজ্ঞাপন চালু ছিল। ২ সেপ্টেম্বর পেইজটি নতুন কনটেন্ট মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং এখনো সেটির অংশ রয়েছে।
মনিটাইজেশনের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন
‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাইরেও ভারত, ফিলিপাইন, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ মেটার মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেইজে মনিটাইজেশন চালু থাকলে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের ধরন ও কনটেন্ট তৈরির ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে, সেই প্রশ্ন তুলেছে ডিসমিসল্যাব।
প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পুলিশ ও সামরিক ইউনিটের মূল দায়িত্ব জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আইন প্রয়োগ করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আর্থিক প্রণোদনা যুক্ত হলে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার চেয়ে আর্থিক লাভকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডিসমিসল্যাব মেটার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। মেটার জবাব পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
যেভাবে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে
ডিসমিসল্যাব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরকারি ওয়েবসাইট, বিশেষ করে সরকারি ডোমেইনের ওয়েবসাইট থেকে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেইজের লিংক সংগ্রহ করে। পেইজ ভেরিফায়েড কি না, তা বিবেচনায় না নিয়ে সরকারি ওয়েবসাইটে থাকা পেইজগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়।
যেসব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মূল ওয়েবসাইটে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের পৃথক ওয়েবপেজ রয়েছে, সেসব পেজে পাওয়া ফেসবুক লিংকও তালিকায় যুক্ত করা হয়।
এরপর মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকা পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রতিটি পেইজ কখন কোন মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে, তা জানতে ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর সংরক্ষিত মনিটাইজেশন আর্কাইভ বিশ্লেষণ করা হয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই বাংলাদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১৯টি পেইজের মনিটাইজেশনের বিষয়টি শনাক্ত করেছে ডিসমিসল্যাব।
সানা/আপ্র/০১/১০/২০২৬